
অপহূত শিশু পরাগকে জীবন্ত ফিরে পাওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই জনমনে স্বস্তি
ফিরে এসেছে। পরিবারেও যে স্বস্তি এসেছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ঘটনার
সঙ্গে জড়িত বেশ কয়েকজন ধরা পড়েছে। অন্যদেরও শনাক্ত করা গেছে। আশা করা যায়,
শিগগিরই তারাও ধরা পড়বে এবং চাঞ্চল্যকর ঘটনা হিসেবে তদন্তও দ্রুত শেষ হবে,
মামলা শুরু হতেও দেরি হবে না।
এ হলো ঘটনার প্রকাশ্য গতিপ্রকৃতি। এর
মধ্যে ছাইচাপা আগুনের মতো আরও ঘটনার আলামত চাপা থাকার আশঙ্কাই বেশি। যারা
শিশু পরাগ অপহরণ অভিযানে অংশ নিয়েছে, তারা তো ঘটনার মূল হোতা নয়, তারা
কারও দ্বারা নিযুক্ত ব্যক্তি। পত্রিকায় আমির নামে যে ব্যক্তির সঙ্গে
পরাগের মুক্তি ও মুক্তিপণ নিয়ে তার বাবার মোবাইল ফোনের আলাপ ছাপা হয়েছে,
তারও পেছনে আরও শক্তিমান কেউ থাকাই স্বাভাবিক। তেমন ইঙ্গিত গণমাধ্যমে
এসেছে। আর খুবই প্রত্যাশিতভাবে সে ব্যক্তি ক্ষমতাসীন দলের কোনো
অঙ্গসংগঠনের স্থানীয় নেতা। বাইরের মানুষ নানা জল্পনা-কল্পনা করলেও পরাগের
বাবা ও পরিবার নিশ্চিতভাবেই এসব বিষয় জানেন।
পত্রিকার খবরে জানা
যাচ্ছে, পরাগের ঠাকুরদা বেশ সহায়সম্পত্তি রেখে গেছেন, উত্তরাধিকারসূত্রে
যার মালিক এখন পরাগের বাবা বিমল মণ্ডল। তাঁর নিজেরও ব্যবসা-বাণিজ্য খারাপ
নয়। একটা জমি নিয়ে স্থানীয় যুবলীগের এক নেতার সঙ্গে তাঁর কিছু দ্বন্দ্ব
ছিল বলে স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন।
সংখ্যালঘু বিমল মণ্ডলের জমিও আছে,
টাকাও আছে। অতএব ক্ষমতাবান উঠতি নেতার নজর পড়েছে সেদিকে, তাঁকে কিছু জমি,
কিছু টাকাও ছাড়তে হবে। এই হচ্ছে হিসাব।
তবে আজকের বাংলাদেশে এ অবস্থা
কেবল সংখ্যালঘুর নয়। আমরা দেখছি জমি, টাকা এবং—গভীর লজ্জা ও ক্ষোভের সঙ্গে
বলতে হচ্ছে—মেয়ে। এই তিন থাকলে এ সমাজে সংখ্যাগুরুও বিপদে পড়তে পারে। এ
রকম সব ঘটনা প্রতিদিন সংবাদপত্রের পাতায় ছাপা হচ্ছে। তবে সংখ্যালঘুর
অবস্থান এ সমাজে দুর্বল, তাই তার সমস্যাও গভীর।
১৯৪৭ পরবর্তীকাল থেকে
এ দেশে হিন্দু সম্প্রদায় রাষ্ট্রীয় বৈষম্য ও নির্যাতনের শিকার হয়ে এসেছে।
এটা পুরো পাকিস্তান আমলে চলেছে, আর পঁচাত্তরের পর থেকে ছিয়ানব্বই পর্যন্ত
বাংলাদেশেও চলেছে। ঔপনিবেশিক ইংরেজ প্রবর্তিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত একদিকে,
আর অন্যদিকে ইংরেজি শিক্ষার প্রতি হিন্দু-মুসলিম মনোভাবের বৈপরীত্যের
সূত্রে ইংরেজ আমলে বাংলায় হিন্দু সম্প্রদায় মুসলমানদের চেয়ে অনেক এগিয়ে
যায়। শুধু লেখাপড়া বা চাকরিবাকরি নয়, সমাজে তাদের প্রতিপত্তি পাকাপোক্ত
ছিল সহায়সম্পদেরও জোরে। পিছিয়ে পড়া মুসলমান মনস্তত্ত্ব, বর্ণহিন্দুর
জাতপাতের গোঁড়ামি আর একশ্রেণীর জোতদার-জমিদারের বাড়াবাড়ির প্রতিক্রিয়া
নিশ্চয় ছিল। আর ঔপনিবেশিক শক্তির ‘ভাগ কর শাসন কর নীতি’ ছাড়াও
হিন্দু-মুসলিমে সন্দেহ-অবিশ্বাস দূর করে নাগরিকসুলভ সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠার
কাজ আমাদের রাজনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি কোনো মহলই গড়ে তুলতে পারেনি।
সাতচল্লিশ-পরবর্তীকালে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় নীতি আর ভারতের পৌনঃপুনিক
দাঙ্গাও কখনো পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক হতে দেয়নি। এর যে প্রতিফল পূর্ব
পাকিস্তানে ঘটেছে, তার একটা বিশেষ ধরন আছে।
প্রথমত, ধর্মের ভিত্তিতে
দেশ ভাগ হওয়ার ফলে অনেক সম্পন্ন হিন্দু ভারতবর্ষে থাকাই তাদের জন্য
স্বাভাবিক ও নিরাপদ বলে মনে করেছে। দ্বিতীয়ত, ছেচল্লিশের দাঙ্গার স্মৃতি
তখনো তাজা ছিল বলে অনেকেই সে আশঙ্কায় ভারতে যাওয়াই নিরাপদ মনে করেছেন।
তৃতীয়ত, কলকাতা দীর্ঘকাল বাংলার রাজধানী ও শিক্ষা, চাকরি-ব্যবসা-সংস্কৃতির
প্রাণকেন্দ্র হওয়ায় শিক্ষিত চাকরিজীবী ও বিত্তবান বাঙালিমাত্রই কলকাতামুখী
ছিল। ফলে দেশভাগের মাধ্যমে কলকাতা ভারতে থেকে যাওয়ায় এই শ্রেণীর হিন্দুরা
ভারতে স্থায়ীভাবে থাকাই শ্রেয় মনে করেছেন। কিন্তু এর ফলে হঠাৎ করে
পূর্ববঙ্গে—অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তান, আজকের বাংলাদেশে—হিন্দু শিক্ষিত
চাকরিজীবী ও প্রভাবশালী ব্যক্তির আকাল পড়ে গেল। শূন্যস্থান তো শূন্য থাকে
না। পেশা, চাকরি, বৃত্তির শূন্যতা হয়তো গুণে-মানে পূরণ হতে বহুদিন সময়
নিয়েছে, হয়তো এখনো তা পূরণ হয়নি। কিন্তু সংখ্যালঘুর জায়গা-জমি, বাড়িঘর তখন
থেকেই অল্প দামে অল্প আয়াসে পাওয়া যাচ্ছিল। পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় নীতি,
যা এ দেশে জেনারেল জিয়াউর রহমান ও তাঁর দল অনুসরণ করেছে, তাতে হিন্দুর
পক্ষে চৌদ্দ পুরুষের সম্পত্তি রক্ষা, চাকরিতে উন্নতি করা (অলিখিত বিধান
ছিল, কোনো পেশায় শীর্ষ পদে হিন্দু যেতে পারবে না, যেমন সামরিক বাহিনীতে
মেজরের বেশি নয়, প্রকৌশলী হলে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হবে না, প্রশাসনে
সচিব পদে প্রমোশন পাবে না ইত্যাদি।) এবং শিল্প-বাণিজ্যে বিনিয়োগ ও
ব্যাংকিং-সুবিধা পাওয়ার অসুবিধা ঘটছিল। মানুষের কাছে নিজের এবং সন্তানদের
নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই বাস্তবতায় তারা এ দেশে
তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়বে, এতে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই।
সহায়সম্পত্তি, চাকরি কিংবা বাড়ির মেয়ের নিরাপত্তা—কোনো একটি ক্ষেত্রে কোনো
রকম আঘাত এলে তার মনে ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা নিয়ে দুর্ভাবনা উপস্থিত হয়। আর
তখন হিন্দুপ্রধান দেশ, সে দেশের আত্মীয়স্বজন এবং তুলনামূলক স্থিতিশীল
অবস্থা মিলিয়ে তার জন্য বিকল্প স্থান হিসেবে দাঁড়ায় ভারতবর্ষ। এটাই এ
দেশের সংখ্যালঘু মনস্তত্ত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পরাগ অপহরণের ঘটনায় আমরা
ফিরে আসি। পরাগের বাবার জমি ও সম্পত্তির ওপর যার নজর পড়েছে, সে এ পর্যায়ে
হাল ছেড়ে দেবে, তেমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। কেননা, সে বা তার মতো
মানুষেরা জানে, পরাগ ফিরে এলেও, সুস্থ হয়ে উঠলেও, এ পরিবারের সদস্যদের মনে
আশঙ্কার বীজ ঢুকিয়ে দেওয়া গেছে। সত্যিই তো, একদিকে ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকা
ক্ষমতাধর ব্যক্তির আচরণ ভবিষ্যতে কেমন হবে, তা অনিশ্চিত। আর অন্যদিকে
কাছের মানুষ অনেকেই একবাক্যে বলবেন, নাহ্, বোধ হয় থাকা যাবে না এ দেশে।
১৯৪৭-এর পরে অনেকবার বড় রকম ধাক্কা খেয়েছে এ দেশের হিন্দু সম্প্রদায়—১৯৫০,
১৯৫৮, ১৯৬৪, ১৯৬৫, ১৯৭১, ১৯৭৫, ১৯৯০, ১৯৯২, ২০০১। তার ওপর আছে পরাগ
অপহরণের মতো অজস্র বিচ্ছিন্ন ঘটনা। সব মিলিয়ে হিন্দু মনস্তত্ত্বে অত্যন্ত
সংগতভাবে এ দেশে স্থায়ীভাবে থাকা যাবে কি যাবে না, এ দ্বন্দ্ব কাজ করতে
থাকে। কিন্তু এতে সুযোগ নিচ্ছে একশ্রেণীর ভূমিদস্যু, বেপরোয়া দুর্বৃত্ত
মানুষ।
ইতিমধ্যে, রাজনৈতিক অনেক ব্যর্থতার মধ্যেও এবং বিশ্বায়নের নানা
নেতিবাচক প্রভাবের মধ্যেও, সামাজিক ক্ষেত্রে কিছু গুণগত পরিবর্তন এসেছে।
এর পেছনে ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিকতার একটি ভূমিকা আছে। মানবাধিকার, নারী ও
শিশুর অধিকার, সংখ্যালঘুর অধিকার, আদিবাসী ও প্রান্তিক মানুষের অধিকার
ইত্যাদি ইস্যুতে বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার পর্যবেক্ষণ ও
মনিটরিং আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে এবং কার্যকর হয়েছে। গণমাধ্যম, এনজিওসহ
বিভিন্ন নাগরিক ফোরাম এসব ক্ষেত্রে আগের চেয়ে কার্যকরভাবে সোচ্চার হচ্ছে।
এমনকি ধর্ম, বর্ণ, জাতিগত ক্ষেত্রেও, নানা বিভ্রান্তি সত্ত্বেও, বর্তমান
সরকারের ভূমিকায় ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। আজকে সচিব, উপাচার্য, অধ্যক্ষ,
তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীসহ চাকরিতে শীর্ষ পদে যেমন অনেক সংখ্যালঘু আছেন,
তেমনি মন্ত্রী, নেতা, মিডিয়াকর্মী, ব্যবসায়ী হিসেবেও সফল অনেকেই। এদিকে
ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধন গাঢ়তর হওয়ার ফলে আঞ্চলিক রাজনীতিতে তাদের
আধিপত্য বাড়ার বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে আমাদের ঠিকই, তবে এর ফলে সংখ্যালঘুর
ওপর একতরফা নির্যাতন চালিয়ে যাওয়াও আজ সম্ভব নয়। গঠনমূলক প্রতিক্রিয়া পেতে
অনেক সময় দেরি হলেও শেষ পর্যন্ত কিছু কাজ হচ্ছে। রামুর ঘটনায় সরকার ও
প্রশাসনের প্রতিকারের উদ্যোগ যেমন দেখা গেছে, তেমনি রোহিঙ্গা সমস্যারও
সমাধানের আশা জাগছে এখন। এটি হয়তো অতি-আশাবাদীর কথা হবে না, যদি বলি যে আজ
ক্ষমতায় গেলে ২০০১ সালের মতো ঘটনা ঘটাতে বিএনপিও সাতপাঁচ ভাববে, হয়তো ভেবে
বিরতও থাকবে।
কথা হলো, এই যদি-কিন্তু-হয়তো দিয়ে যে আশাবাদ তৈরির
চেষ্টা করছি আমি, তার ওপর ভরসা করতে পারবে কি বিমল মণ্ডল ও তাঁর পরিবার?
এই একটি ঘটনাকে আমাদের সরকার, আওয়ামী লীগ, হ্যাঁ, বিএনপিও এবং হিন্দু
বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ একটি টেস্ট কেস হিসেবে নিতে পারে বলে আমার
বিশ্বাস। এই বিপদগ্রস্ত পরিবারের পাশে সবাইকে মিলেই দাঁড়াতে হবে।
প্রতিবেশীদের নিয়ে বৈঠক করতে হবে, যাতে একদিকে পুলিশ তার ভূমিকা যথাযথভাবে
পালন করে এবং সব দোষী ব্যক্তির বিচার ও সাজা হয়, আর অন্যদিকে আরও একটি
সংখ্যালঘু পরিবার যেন দেশ ত্যাগে বাধ্য না হয়। এ কাজে প্রথম দায়িত্ব
এলাকাবাসীর, বিশেষ করে এলাকার সংখ্যাগুরু সমাজের নেতাদের। তাঁরাই যদি
উদ্যোগী হয়ে আওয়ামী লীগ-বিএনপি নেতা এবং হিন্দু-মুসলিমসহ সবাইকে সঙ্গে
নিয়ে বৈঠক করে এলাকায় শান্তি ও সম্প্রীতির বাতাবরণ তৈরির কাজ করেন, তাহলে
দুষ্কৃতকারীরা পিছু হটতে বাধ্য হবে। মনে রাখতে হবে, বিপদগ্রস্ত মানুষের
মনের সন্দেহ দূর করে আস্থা ফিরিয়ে এনে তাদের আস্থাভাজন হতে হলে সব উদ্যোগে
আন্তরিক হতে হবে এবং সমস্যার স্থায়ী সমাধান না হওয়া পর্যন্ত সক্রিয় থাকতে
হবে। নির্যাতিত সংখ্যালঘুদের দেশত্যাগ ঠেকাতে ব্যাকুল হয়ে প্রয়াত কবি
শামসুর রাহমান লিখেছিলেন, ‘সুধাংশু যাবে না।’ তাঁর আশাবাদ সেদিন আমরা
রক্ষা করতে পারিনি। আজ পারতে হবে। কেননা প্রথমত, ঘুরে দাঁড়াতেই হবে আজ শুভ
বাংলাদেশকে আর দ্বিতীয়ত, আজ সত্যিই জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে পরিস্থিতি
ঘুরে দাঁড়ানোর পক্ষে সহায়ক।
অতএব কেরানীগঞ্জবাসী, সরকারি দল, বিএনপি,
হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে এর প্রভাব
হবে সুদূরপ্রসারী এবং তা অবশ্যই হবে শুভ প্রভাব।
আবুল মোমেন: কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক।