২০০৯ সাল থেকে এ পযর্ন্ত ৪ বছরে ৪৬২ জন বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন।
গুমের শিকার হয়েছেন ১৫৬ জন। এসব কারণে বিচার ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি
মানুষের আস্থা কমছে। অপরদিকে, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন পুনর্গঠন করা হলেও এর কোনো নীতিমালা নেই। আর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না। বিচার বিভাগকে শাসন বিভাগ থেকে আলাদা করা হলেও তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
এসব কথা বলা হয়েছে জাতিসংঘে পাঠানো বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি বিষয়ক এক প্রতিবেদনে।
সম্প্রতি দেশের মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থাগুলোর সংগঠন হিউম্যান রাইটস ফোরাম জাতিসংঘে এ প্রতিবেদন পাঠিয়েছে।
দেশের বিভিন্ন পযার্য়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এ প্রতিবেদন করা হয়েছে। আর পযবের্ক্ষণের সময়কাল হিসেবে ধরা হয়েছে ২০০৯ সাল থেকে ২০১২ সালকে।
জাতিসংঘের সার্বজনীন পূনর্বীক্ষণ পদ্ধতির (ইউডিআর) আওতায় প্রতি চার বছর অন্তর জাতিসংঘের প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্র এ পযার্লোচনা প্রতিবেদন পাঠায়।
বৃহস্পতিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে পাঠানো প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হয়। ফোরামের সদস্য প্রতিষ্ঠান ‘নাগরিক উদ্যোগ’র প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন বিস্তারিত তুলে ধরেন।
এসময় ফোরাম সভাপতি সাবেক তত্ত্ববধায়ক সরকারের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ’র (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, ব্লাস্ট’র সম্মানীত পরিচালক ব্যারিস্টার সারা হোসেন উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশের পাশাপাশি এর থেকে উন্নয়নে বেশি কয়েকটি সুনির্দিষ্ট সুপারিশ জাতিসংঘে পাঠানো হয়েছে বলে জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, এবারের ইউপিআর প্রতিবেদনে অর্থনৈতিক, সামাজিক, নাগরিক, রাজনৈতিক অধিকার, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়মুক্তি, বিরোধী দলের নেতাদের ওপর হামলা, শ্রমিকদের ওপর হামলা, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, বিচার বিভাগ নিয়ে ফোরাম গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
ফোরামের মতে, বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি নেই।
নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার
জাকির হোসেন বলেন, নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারে সরকার অনেকটা পিছিয়ে। বিশেষ করে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যা বেড়েছে। ২০০৯ সালে সরকার অঙ্গীকার করেছিল, এ ধরনের হত্যাকাণ্ড সরকার বরদাশত করবে না। কিন্তু তথ্য মতে, ২০০৯ সাল থেকে ২০১২ সাল পযর্ন্ত ১৫৬ জন গুম হয়েছেন। যারমধ্যে ২৮ জনের লাশ পাওয়া গেছে। একই সময়ে ক্রসফায়ারের নামে ৪৬২ জন বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘‘বিচার বিভাগ পুরোপুরি স্বাধীন ভাবে কাজ করছে না। এর ফলে বিচার বিভাগ ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা কমে যাচ্ছে।’’
‘‘অপরদিকে এসব অপরাধের বিচার হচ্ছে বলে সরকার দাবি করছে। কিন্তু এই তথ্য আমরা জানি না। যদি তাদের বিচারের আওতায় আনা হয়ে থাকে তবে তা প্রকাশ করা উচিত।’’
জাকির হোসেন বলেন, প্রতিবেশি ভারতের আশ্বাসের পরও সীমান্তে বাংলাদেশের নাগরিক হত্যা বন্ধ হয়নি। এ ব্যাপারে সরকারের কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও প্রশ্নবিদ্ধ। ২০০৯ সাল থেকে এ পযর্ন্ত ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে ২৭০ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
জাতীয় প্রতিষ্ঠান
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের নীতিমালা নেই। পাশাপাশি জনবলের অভাবে এবং আইনগত বাধার কারণে এটি কাজ করতে পারছে না। নেই দুর্নীতি দমন কমিশনের কর্মকর্তাদেরও কোনো আচরণবিধি।
নারীর অধিকার
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ইউপিআর প্রতিবেদনে নারীর প্রতি পারিবারিক নিযার্তন, বৈষম্যমূলক আইন, নিযার্তন, ধর্ষণ, ফতোয়া, যৌন হয়রানির বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে।
সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা
ফোরামের মতে, বাংলাদেশে গণমাধ্যমগুলো অপেক্ষাকৃতভাবে স্বাধীনভাবে কাজ করলেও নীবর নিষেধাজ্ঞা বা প্রভাব রয়েছে তাদের ওপর। সাংবাদিক নিযার্তন, সংবাদপত্রের প্রকাশনা বন্ধ, টিভি চ্যানেল বন্ধ, টিভি টকশো’র ব্যাপারে সরকারের আপত্তি, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের চেষ্টা স্বাধীন মত প্রকশকে খর্ব করে।
শরণার্থী ইস্যু
সম্প্রতি মিয়ানমার দাঙ্গার ফলে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থী আশ্রয় দিতে বাংলাদেশের অস্বীকৃতি মানবতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে এবারের ইউপিআর প্রতিবেদনে।
সুপারিশমালা
হিউম্যান রাইটস ফোরামের প্রতিবেদনে যেসব সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে, রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থা কর্তৃক মানবাধিকার লঙ্ঘনের যেসব অভিযোগ পাওয়া যায়, তার সুস্পষ্ট তদন্ত করতে হবে। অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করতে হবে।
সীমান্তে নাগরিক হত্যা বন্ধে জোড়ালো কূটনৈতিক উদ্যোগ নিতে হবে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানান জাকির হোসেন।
বিচারক নিয়োগে কমিশন
বিচারক নিয়োগে জুডিশিয়াল সার্বিক কমিশনকে সহায়তা করার জন্য একটি স্বাধীন কমিশন গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি নিয়োগে যাতে কোনো ধরনের জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের ঘটনা না ঘটে তার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। এজন্য সর্বোচ্চ আদালতের বিচারক নিয়োগে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রনয়ণ করতে হবে।

0 মন্তব্য:
Post a Comment
আপনার মতামত দিন