সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আঘাত নিয়ে চিকিৎসাধীন প্রবীণ আলোকচিত্রী বিজন সরকারের শারীরিক অবস্থার আরো অবনতি হয়েছে। চিকিৎসকরা বলছেন তার অবস্থা সঙ্কটাপন্ন।
দুর্ঘটনায় মাথায় আঘাত লেগে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের পর গত আটদিন ধরে রাজধানীর সিটি হাসপাতালে ‘নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে’ চিকিৎসা চলছে তার।
হাসপাতালে তাকে দেখে আসার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের নিওরো সার্জন অধ্যাপক কনক কান্তি বড়–য়া বৃহস্পতিবার বলেন, “বিজন সরকারের অবস্থা সঙ্কটাপন্ন। তার মস্তিষ্কের খুব স্পর্শকাতর জায়গায় (ব্রেইন স্টেম) রক্তক্ষরণ হয়েছে।”
এই আলোকচিত্র শিল্পীর মাথায় পানি (সিএসএফ) জমে যাচ্ছে, যা অস্ত্রপচারের মাধ্যমে বন্ধ করা প্রয়োজন বলে মত দেন এই চিকিৎসক।
তিনি বলেন, “এটি একটি জীবন রক্ষাকারী প্রক্রিয়া”।
বিজন সরকারের চিকিৎসা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আলোকচিত্রী গোলাম মোস্তফা বলেন, “দেশের অন্যতম পথিকৃৎ আলোকচিত্রী বিজন সরকারের সুষ্ঠু চিকিৎসায় সরকারের পদক্ষেপ আশা করছি আমরা।”
বাংলাদেশ টেলিভিশনের ক্যামেরা বিভাগের সাবেক এই পরিচালক বলেন, আলোকচিত্রী সমাজসহ সংস্কৃতিকর্মীরা চিকিৎসা প্রক্রিয়ায় পরিবারের সদস্যদের সহায়তায় চেষ্টা করছেন। তবে, তা অপর্যাপ্ত।
“বাংলাদেশের আলোকচিত্র শিল্প এই মহৎ শিল্পীর কাছে ঋণী। তাঁকে বাঁচাতে সংস্কৃতিকর্মীসহ সবার এগিয়ে আসা দরকার।”
নাট্যব্যক্তিত্ব শঙ্কর সাঁওজাল বলেন, “চিকিৎসায় সহায়তার জন্য বিজন সরকারের পরিবারের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন করা হয়েছে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, তথ্য মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়েও এ বিষয়ে আবেদন করা হয়েছে।”
তিনি জানান, এ আবেদন করার পরপরই সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় বিজন সরকারের চিকিৎসায় পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেয়। তবে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত তাদের কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।
শুক্রবার বিজন সরকারের মাথায় অস্ত্রোপচার করা হতে পারে বলে জানান তিনি।
গত ২০ নভেম্বর সন্ধ্যায় রাজধানীর বিজয়নগরে রাস্তা পার হওয়ার সময় মোটর সাইকেলের ধাক্কায় গুরুতর আহত হন বিজন সরকার। দ্রুতগতির মোটর সাইকেলটিতে আরোহী ছিল তিন তরুণ। দুর্ঘটনায় মাথায় আঘাত ছাড়াও একটি হাত ভেঙে যায় আলোকচিত্রীর।
বিজন সরকারের বড় ছেলে আলোকচিত্রী জয়ব্রত সরকার জানান, দুর্ঘটনার পরপরই পথচারীরা তার বাবাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু সেখানে ‘নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে’ জায়গা না পাওয়ায় ওই রাতেই তাকে সিটি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
পাকিস্তান জিওলজিকাল সার্ভের আলোকচিত্রী হিসাবে বিজন সরকারের পেশাজীবন শুরু ১৯৬২ সালের দিকে। ১৯৬৯ সালে যোগ দেন তখনকার পাকিস্তান টেলিভিশনের ক্যামেরাম্যান হিসাবে।
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান সরকারের নির্দেশে তাকে কাজ থেকে অব্যাহতি দেয় টেলিভিশন কর্তৃপক্ষ। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন বিজন।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে প্রধান আলোকচিত্রী হিসেবে নবগঠিত বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনে যোগ দেন তিনি। ১৯৯৫ সালে ওই প্রতিষ্ঠন থেকেই অবসর নেন।
বিজন সরকারের জন্ম ১৯৩৩ সালের ১১ এপ্রিল গাইবন্ধা জেলার কামারযানীতে। তার বাবার নাম গৌরনাথ সরকার।
অল্প বয়সেই পরিবারের ভার কাঁধে নেওয়ায় বিজন সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া বেশিদূর এগোয়নি। তবে প্রবল আগ্রহের কারণে তিরিশের কাছাকাছি বয়সে তৎকালীন ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন তিনি।
আলোকচিত্রের প্রতি বিজন সরকারের আগ্রহের জন্ম পারিবারিক পরিমণ্ডল থেকেই। বড় ভাই তারাপদ সরকার ছিলেন স্বশিক্ষিত শিল্পী। বাণিজ্যিক শিল্পের পাশাপাশি তিনি চিত্রকলা-ভাস্কর্যের চর্চাও করেতন। বড় ভাইয়ের ক্যামেরাতেই বিজনের প্রথম ছবিতোলা।
বাবা-মায়ের মৃত্যু এবং নদীভাঙনে পারিবারিক ভিটে-মাটি হারিয়ে ঢাকায় চলে আসেন বিজন সরকার। এরপর ঢাকায় বিখ্যাত আলোকচিত্রী গোলাম কাশেম ড্যাডির পরিচালিত প্রথম আলোকচিত্র প্রশিক্ষণ কর্মশালায় অংশ নেন। ওই কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী অল্পসংখ্যকের মধ্যে অগ্রগণ্য আলোকচিত্রী মঞ্জুর আলম বেগও ছলেন।
দেশের আলোকচিত্র শিল্পের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা বিজনের হাত ধরেই ১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠা পায় ‘বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটি’। এ সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সহ-সভাপতি ছিলেন তিনি। পরে সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র আন্দোলনের সূচনাকাল থেকেই নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন বিজন সরকার। ‘নদী ও নারী’ চলচ্চিত্রে কাজ করেন সহকারী সিনেমাটোগ্রাফার হিসাবে।
স্বাধীনতার পর চলচ্চিত্র আন্দোলন জোরদার করতে গড়ে তোলা ‘বাংলাদেশ ফিল্ম সোসাইটি’রও অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য তিনি।
আলোকচিত্রকে চিত্রকলার মতোই শিল্পকলার একটি সম্ভবনাময় মাধ্যম মনে করতেন বিজন সরকার। নিরীক্ষাধর্মী এই শিল্পীর প্রথম আলোকচিত্র প্রদর্শনীটিও ছিল অনন্য।
তার অনুজপ্রতিম আলোকচিত্রী গোলাম মোস্তফা জানান, ১৯৬৭/৬৮ সালের দিকে ঢাকায় বিজন সরকারের প্রথম প্রদর্শনীর বেশিরভাগ ছবিই ছিল ‘আলো দিয়ে আঁকা ছবি’ (ক্যামেরা দিয়ে ছবি না তুলে কাগজের ওপর বিশেষ রাসায়নিক ব্যবহার করে তুলি দিয়ে ছবি এঁকে আলোর সাহায্যে এই ছবি প্রিন্ট করা হয়)। দেশের অন্য কোনো আলোকচিত্রী এই মাধ্যমে তখন পর্যন্ত করেননি।
ঊনিশশ সত্তরের দশকে রাওয়ালপি-িতেও একটি একক প্রদর্শনী হয় বিজনের। নামের মতোই নিভৃতচারী এই শিল্পী এরপর আর কোনো একক প্রদর্শনী করেননি। তবে বেশকিছু যৌথ প্রদর্শনী ও প্রতিযোগিতায় তার আলোকচিত্র এসেছে।
বাংলাদেশের প্রকৃতি ও গ্রামীণ জীবনের অনুপম সৌন্দর্য পরম মমতায় ক্যামেরায় ধরে রেখেছেন বিজন সরকার। বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি ফুটিয়ে তুলতে তার অসামান্য কাজের স্বীকৃতি হিসেবে আন্তর্জাতিক পুরস্কাও পেয়েছেন।
১৯৭৬ সালে জাপানের সম্মানজনক ‘এসিসিইউ’ প্রতিযোগিতায় প্রথম পুরস্কার পান বিজন সরকার। ১৯৭৮ সালে পান কমনওয়েলথ পুরস্কার।
বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে ‘পিএটিএ গোল্ড অ্যাওয়ার্ড’ জেতে ‘গ্রামীণ বাংলাদেশ’ নামে একটি পোস্টার। বিজন সরকারের তোলা তিনটি ছবি দিয়েই এ পোস্টার বানানো হয়েছিল।
এছাড়া বিভিন্ন সময়ে দেশ ও দেশের বাইরে বিভিন্ন প্রতিযোগিতা ও প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করে পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন তিনি।
অবসর জীবনের পরও আলোকচিত্রী সমাজে সক্রিয় ছিলেন সুস্বাস্থ্যের অধিকারী ৭৯ বছর বয়সী এই শিল্পী। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটির উপদেষ্টা ও সংগঠনটির আজীবন সদস্য।


0 মন্তব্য:
Post a Comment
আপনার মতামত দিন