বিদ্যুৎ ব্যবহারে আরো সাশ্রয়ী হওয়ার জন্য দেশের সর্বস্তরের নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
রোববার কেরানীগঞ্জের চর গলগলিয়ার আবদুল্লাহপুরে ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “আমরা বিদ্যুৎ উৎপাদন করব, আর ঢালাওভাবে খরচ হবে- এটা তো ঠিক না।”
দেশবাসীর উদ্দেশে শেখ হাসিনা বলেন, “বিদ্যুতের খরচ এখন অনেক। তারপরও আমাদের কেন ভতুর্কি দিতে হবে? সাশ্রয়ী হতে হবে- যেন বিদ্যুত বিল কম আসে।”
মালয়েশিয়াভিত্তিক মুতিয়ারা কনসোলিডেটেড এসএনবি বিএইচডি এবং বাংলাদেশের শিকদার গ্রুপের পাওয়ার প্যাক হোল্ডিংসের যৌথ কোম্পানি কেরানীগঞ্জের এ বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করেছে।
প্রধানমন্ত্রী সকালে বিদ্যুৎ কেন্দ্রে পৌঁছালে কেরানীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদ তাকে স্বাগত জানান। অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছেই প্রধানমন্ত্রী এই ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি উদ্বোধন করেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে নিজের বক্তব্যের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী সবাইকে বিজয়ের মাসের শুভেচ্ছা জানান।
তিনি বলেন, “রক্ত দিয়ে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে কেরানীগঞ্জের অনেক অবদান আছে।”
আওয়ামী লীগ এর আগে ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় গিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট থেকে ৪ হাজার ৩০০ মেগাওয়াটে উন্নীত করে জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, “আমরাই প্রথম বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের নীতিমালা প্রণয়ন করি। বিদ্যুৎ উৎপাদনে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে সক্ষম হই। সিস্টেম লস কমিয়ে আনি।”
“এরপর ২০০৯ সালে এসে দেখি বিদ্যুৎ উৎপাদন ৩ হাজার ২০০ মেগাওয়াটে নেমে গেছে”, বলেন প্রধানমন্ত্রী।
বর্তমান সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়ায় এবং তাৎক্ষণিক, স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি হাতে নেওয়ায় বর্তমানে দেশে বিদ্যৎ উৎপাদনের সামর্থ্য ৮ হাজার ৪২৫ মেগাওয়াটে উন্নীত করা সম্ভব হয়েছে বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।
“আমরা পুরাতন বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো সংস্কার করি। দ্রুত চাহিদা পূরণে রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণকে অগ্রাধিকার দেই।”
আর এর ফলেই সম্প্রতি রেকর্ড ৬ হাজার ৩৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
গত চার বছরে সরকার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির চেয়েও বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে সক্ষম হয়েছে মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের ৫৮ শতাংশ মানুষ এখন বিদ্যুৎ সেবার আতওায় রয়েছে।
“আমরা চাহিদা মতো বিদ্যুৎ উৎপাদন করছি। এর সঙ্গে দিনে দুই ঘণ্টা লোড শেডিং হচ্ছে।”
তৃণমূল পর্যায়ে যেসব স্থানে এখনো বিদ্যুত যায়নি- সেসব স্থানে সৌর বিদ্যুতের ব্যবস্থা করার জন্য জনপ্রতিনিধিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন প্রধানমন্ত্রী।
ঢাকা-৩ আসনের সাংসদ নসরুল হামিদ বিপু এই ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে উৎপাদিত বিদ্যুতের পুরোটা জাতীয় গ্রিডে না দিয়ে ২৫ মেগাওয়াট কেরানীগঞ্জে দেয়ার আহ্বান জানান।
জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, “আমরা একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি- যে এলাকায় বিদ্যুৎ কেন্দ্র হবে, সে এলাকার মানুষ অগ্রাধিকার পাবে।”
স্থানীয় সাংসদ ও আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম অনুষ্ঠানে জানান, ওই এলাকায় কোনো সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় বা কলেজও নেই।
তার এ বক্তব্যে বিস্ময় প্রকাশ করে সরকার প্রধান বলেন, “প্রদীপের নিচেই অন্ধকার। ঢাকার এতো কাছে, অথচ এখানে কোনো উচ্চ বিদ্যালয় আর কলেজ নেই!”
আওয়ামী লীগ আগামীবার ক্ষমতায় এলে চর গলগলিয়ার আবদুল্লাহপুরে বিদ্যালয় ও কলেজ করে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রত্যেক উপজেলায় একটি করে ফায়ার স্টেশন করার সরকারি সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “ফায়ার স্টেশন হবে। তবে আমার একটা অনুরোধ ফায়ার সার্ভিস যেন আগুন নেভানোর পানি পায়।”
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “যে কোনো পরিকল্পনা করলে যেন জলাধার থাকে- সে দিকে একান্তভাবে নজর রাখবেন।”
আগামীতে সব সেতু ও রাস্তা টোলভিত্তিক করার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “গরীব শ্রমিক আর কৃষকরা কাজ করবে আর আমরা শুধু গাড়িতে চড়ব? আগামীতে সব রাস্তা ও সেতুতে টোল দিতে হবে।”
অন্যদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা তৌফিক ই এলাহী চৌধুরী, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী এনামুল হক, জাতীয় সংসদের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি সুবিদ আলী ভূঁইয়া, বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব আবুল কালাম আজাদ এবং শিদকার গ্রুপের চেয়ারম্যান জয়নুল হক শিকদার অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন।
অনুষ্ঠানে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন বিদ্যুৎ বোর্ডের চেয়ারম্যান আব্দুল ওয়াহাব খান।
সাত দশমিক ১১ একর জমির ওপর এই ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মাণে ২০১০ সালের জুলাই মাসে পাওয়ার প্যাক মুতিয়ারার সঙ্গে চুক্তি করে সরকার। গত বছর মার্চে এই কেন্দ্র থেকে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হওয়ার কথা থাকলেও তা শুরু হয় চলতি বছর মার্চে।


0 মন্তব্য:
Post a Comment
আপনার মতামত দিন