তাজরিন ফ্যাশনসে অগ্নিকাণ্ড নিয়ে গণমাধ্যমের ভূমিকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পোশাক শিল্প মালিকরা, যাদের বিরুদ্ধে কারখানাগুলোর পরিবেশ নিয়ে অভিযোগের আঙুল।
তাজরিনে অগ্নিকাণ্ডে শতাধিক শ্রমিকের মৃত্যুর পাঁচদিন পর বৃহস্পতিবার শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজেএমইএ জরুরি সাধারণ সভা করে।
ওই সভায় মালিকদের প্রায় সবাই গণমাধ্যমের সমালোচনায় মুখর হন। তারা বলেন, গণমাধ্যম জাতিকে ‘উত্ত্যক্ত’ এবং পোশাক শিল্পের আন্তর্জাতিক বাজারকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের ছবি ছাপানো এবং টেলিভিশনের অনুষ্ঠানগুলোতে আলোচনা নিয়েও বেশ চটেছেন শিল্প মালিকরা।
সভার সূচনা বক্তব্যে বিজিএমইএ সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন এক পর্যায়ে বলেন, “মিডিয়া মনের মাধুরী দিয়ে লিখছে।”
এরপর আরো ১৪ জন আলোচনায় অংশ নেন, তাদের বক্তব্যের বড় অংশ জুড়েই ছিল গণমাধ্যমের সমালোচনা। এই জরুরি সভাটি এক পর্যায়ে গণমাধ্যমের সমালোচনা সভায় রূপ নেয়।
গালফ টেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রেজাউল আলম মীরু বলেন, “মিডিয়ার ভূমিকা শিল্পের পক্ষে নয়। অনেক ষড়যন্ত্র হচ্ছে। আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।”
ফ্যালকন ইন্টারন্যাশনালের মালিক, বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মাহতাব উদ্দিন আহমেদ টেলিভিশনের টক শোর আলোচকদের সমলোচনা করে বলেন, “না জেনে, না বুঝে বক্তব্য দিচ্ছেন তারা। আমি ঘৃণাভরে তাদের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করছি।”
“দরকার হলে আমি অতিরিক্ত বেতন দেব অথবা আমার দুটো কারখানার ২৫ শতাংশ মালিকানা দেবে। তারা আসুক আর কাজ করে দেখাক, কীভাবে ম্যানেজ করতে হয়। মিডিয়া জাতিকে উত্ত্যক্ত করছে,” ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন তিনি।
সিমকো গ্রুপের চেয়ারম্যান মোজাফফর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, “মিডিয়া আমাদের ভিলেন বানিয়ে দিয়েছে। তারা কি আরো লাশ চায়? মিডিয়ার কারণে বায়াররা অর্ডার বাতিল করছে।”
বিজিএমইএর পরিচালক শাহাদাত হোসেন অরুণ বলেন, “টিভিতে আমাদের হেয় প্রতিপন্ন করা হচ্ছে।”
তিনি গণমাধ্যমের মালিক ও সম্পাদকদের নিয়ে দ্রুত বৈঠক করে দেশের অর্থনীতিতে পোশাক খাতের অবদান তুলে ধরার পরামর্শ দেন।
বিজিএমইএর সহসভাপতি এস এম মান্নান কচি বলেন, “আন্তর্জাতিক বাজার নষ্ট হওয়ার মতো সংবাদ প্রচার করা হচ্ছে। দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে।”
গণমাধ্যম নিয়ে সমালোচনার এক পর্যায়ে সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন এক পর্যায়ে আলোচনার মূল বিষয়ে আসতে বক্তাদের প্রতি আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, “মিডিয়ার ঢালাও সমালোচনা করা ঠিক হবে না। অনেকে আমাদের ভুলগুলো ধরিয়ে দিচ্ছেন। তবে অনেকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে।”
“দেশে লঞ্চ ডুবি, অন্যান্য অগ্নিকাণ্ড, সড়ক দুর্ঘটনা ইত্যাদিতে অনেক মানুষ মারা যাচ্ছে। সেখানে কোনো ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা নেই। কিন্তু আমরা দিচ্ছি।”
“হন্ডুরাসের জেলে একসঙ্গে ৩৬১ জন ও পাকিস্তানের করাচির একটি ফ্যাক্টরিতে ১৬০ জন মারা গেছে। সেই তুলনায় আমরা অনেক প্রাণ বাঁচাতে পেরেছি। এগুলো মিডিয়াকে বুঝতে হবে,” বলেন তিনি।
পোশাক রপ্তানিতে বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা বাংলাদেশের কারখানাগুলোর পরিবেশ নিয়ে বরাবরই সমালোচনামুখর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো।
তাদের চাপে বিদেশি ক্রেতারাও বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলোতে কাজের পরিবেশ উন্নয়নের তাগিদ দিয়ে আসছে।
তবে শ্রমিক নেতাদের অভিযোগ, মালিকরা লাভ করলেও শ্রমিকদের সুরক্ষার প্রতি তাদের নজর নেই।
তাজরিন কারখানায় জরুরি নির্গমন পথ ছিল না এবং অগ্নিকাণ্ডের সময় ফটকে তালা ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে, যা ব্যাপক সংখ্যক প্রাণহানির জন্য দায়ী বলে মনে করা হচ্ছে।
বিজিএমইএ সভাপতি তাজরিন ফ্যাশনসকে ‘কমপ্লায়েন্ট’ বলে রায় দিলেও কারখানাটির পরিবেশ দেখে সেখান থেকে ওয়ালমার্টের কার্যাদেশ ফেরত এনেছিল তাদেরকে কাজ সরবরাহ করা সহযোগী আরেকটি প্রতিষ্ঠান, যা নিয়ে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে সংবাদ প্রকাশ হয়েছে।


0 মন্তব্য:
Post a Comment
আপনার মতামত দিন