বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকায় তৈরি পোশাক খাতের প্রতি সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হলেও এই খাতের কারিগরদের তেমন অগ্রগতি হয়নি বলে শ্রমিক নেতারা অভিযোগ করেছেন।
বিশ্ব ব্যাংকের বার্ষিক উন্নয়ন প্রতিবেদনকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ‘অমীমাংসিত রহস্য’ হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। আর ওই রহস্যের মূলে তৈরি পোশাক খাতের কারিগরদের অবদান রয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
দেশের মোট রপ্তানির পাঁচ ভাগের প্রায় চার ভাগই আসে পোশাক রপ্তানি থেকে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সব সময় তৈরি পোশাক শিল্পের পাশে থাকছে সরকার, বাজেটেও রাখা হয় বিশেষ প্রণোদনা।
কিন্তু কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাসহ বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে শ্রমিকদের অবস্থার কোনো পরিবর্তন ঘটেনি বলে অভিযোগ শ্রমিক নেতাদের।
তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র হিসেবে, সারা দেশে পাঁচ হাজারের বেশি পোশাক কারখানা রয়েছে। এসব কারখানায় প্রায় ৩৬ লাখ শ্রমিক কাজ কওে যাদের ৮০ শতাংশই নারী।
২০১১-১২ অর্থবছরে তৈরি পোশাক রপ্তানি করে ২ হাজার কোটি ডলার আয় হয় বলে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) জানায়। অথচ এই পোশাক শ্রমিকদের কর্মস্থল যে কতটা অনিরাপদ, তা শনিবার সাভারের তাজরিন ফ্যাশনসে অগ্নিকাণ্ডে ১১০ শ্রমিকের মৃত্যুই জানান দেয়।
প্রতিবছরই তৈরি পোশাক কারখানায় নানা দুর্ঘটনায় শ্রমিকের প্রাণহানি ঘটে। এর মধ্যে অগ্নিকাণ্ডে মারা যাওয়ার ঘটনা সবচেয়ে বেশি। আর কোনো কারখানায় আগুনে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক শ্রমিকের মৃত্যু ঘটনা ঘটেছে এবার।
বিজিএমইএ’র হিসাবে, ১৯৯০ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত তৈরি পোশাক কারখানায় আগুন লেগে ২৭৫ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।
তবে শ্রমিক নেতাদের হিসাবে, শুধু ২০০০ সালের পর থেকেই সাড়ে ছয়শ’র বেশি শ্রমিক বিভিন্ন কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন।
এ বিষয়ে জাগো বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি বাহরানে সুলতান বাহার বিডিনিউিজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মালিকরা অগ্নিকাণ্ডের পরে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের কথা বলে। তদন্ত কমিটি করে। কিন্তু কোনো তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ করে না।”
অনেক ক্ষেত্রেই অগ্নিকাণ্ডের পেছনে মালিকপক্ষের গাফিলতি বা অন্য কোনো উদ্দেশ্য থাকে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “সে কারণেই এসব রিপোর্ট প্রকাশ করা হয় না।”
এসব অগ্নিকাণ্ডের মাধ্যমে শ্রমিকদের হত্যা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
সম্মিলিত গার্মেন্টস ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা বেগম বলেন, “মালিকরা শ্রমিকদের মূল্যায়ন করে না। তাদের দৃষ্টিতে শ্রমিকরা যেন চোর। যে কারণে কারখানার দরজা, প্রধান ফটক তালাবন্ধ করে রাখে।
“আর তাতে আগুন লাগলে শ্রমিকরা অবরুদ্ধ হয়ে মারা যায়। এটা এক ধরনের হত্যাকাণ্ড।”
আশুলিয়ায় আগুনে শতাধিক শ্রমিক নিহতের বিষয়ে বিজিএমইএ’র সহ-সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “তাজরিন গার্মেন্টসে নিহত ও আহতদের বিজিএমইএ সর্বোচ্চ সহায়তা দেবে। বিজিএমইএ সব সময়ই শ্রমিকদের স্বার্থ আগে বিবেচনা করে।”
তবে বারবার আগুনে প্রাণহানির ঘটনা ঘটলেও তা প্রতিরোধে কোনো উদ্যোগ আছে কি না জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে আছেন বলে ফোন রেখে দেন বিজিএমইএ’র এই কর্মকর্তা।
এ বিষয়ে বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, “কারখানায় অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধ ও ক্ষয়ক্ষতি কমানোর ক্ষেত্রে যতটা অগ্রগতি হওয়া উচিত ছিলো ততটা হয়নি। এর অন্যতম কারণ, অর্থনৈতিক ও সচেতনতার অভাব।”
“অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও দক্ষ জনবলের অভাব রয়েছে। এগুলো অবশ্য একজন শিল্পোদ্যোক্তার পক্ষে করা সম্ভবও নয়। এজন্য সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে।”
বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড
তৈরি পোশাক কারখানায় আগুনে শ্রমিকের মারা যাওয়ার ঘটনা এদেশে অপরিচিত নয়। এর আগেও একাধিকবার কারখানায় আগুনে বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছে।
এর মধ্যে সাভারের স্পেকট্রাম কারখানায় আগুনে ৭০ জন, চট্টগ্রামের কেডিএসে অগ্নিকাণ্ডে ৫৪ জন, আশুলিয়ায় হা-মীম গ্রুপের কারখানায় ২৯ জন, নারায়ণগঞ্জের শান হোসিয়ারি কারখানায় ২৩ জন, মিরপুরের সাবাকা গার্মেন্টসে ২৭ জন ও গরীব অ্যান্ড গরীব কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে ২৭ জন নিহত হয়।
অগ্নিকাণ্ডের কারণ
বিজিএমইএর গবেষণায়ও তৈরি পোশাক কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের জন্য মালিকপক্ষের গাফিলতি ও অসৎ উদ্দেশের কথা বলা হয়েছে।
এছাড়া বিড়ি-সিগারেটের আগুন, বিদ্যুৎ সরবরাহের (ভোল্টেজ) ওঠানামা, মানহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, শর্ট সার্কিট ও ব্রয়লার বিস্ফোরণসহ বিভিন্ন কারণে কারখানায় আগুন লাগে বলে তারা জানায়।
সোয়েটার কারখানায় আগুনে হতাহতের ঘটনা বেশি ঘটার বিষয়ে বিজিএমএইএ’র ওই গবেষণায় বলা হয়, সোয়েটারের সুতা সিনথেটিক যা পেট্রোকেমিক্যাল দিয়ে তৈরি। আগুনে পুড়ে যে গ্যাস বের হয় তাতে মানুষ সহজে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে।
কারখানার ভবনের অবকাঠামোগত অবস্থা (ফ্যাক্টরি লে আউট) অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধমূলক না হওয়ায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেড়ে যায়। আবার বেশিরভাগ কারখানায় বিকল্প বহির্গমন ব্যবস্থা খুব সরু এবং নিয়ম অনুযায়ী প্রশস্ত সিঁড়ি, একাধিক বিকল্প বহির্গমন ব্যবস্থা, মজুদ পানি এবং ওপরে-নিচে যাতায়াতের সুবিধা না থাকায় আগুনে হতাহতের সংখ্যা বাড়ে।
এ বিষয়ে বিজিএমইএর এক কর্মকর্তা বলেন, সংগঠনটির কার্যকর সদস্যদের মধ্যে অনেক কারখানাই আছে যেগুলোকে বিজিএমইএ, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে মালিককে চিঠি দেয়া হয়েছে। কিন্তু মালিকরা তা শুনছেন না। কারখানার অবকাঠামোগত উন্নয়নও হচ্ছে না যাতে ঘটছে দুর্ঘটনা।
ঢাকা, চট্টগ্রাম, সাভার, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ এলাকায় তৈরি পোশাকের কয়েক হাজার কারখানা রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে গড়ে উঠলেও এখনো কোনো কাঠামোর মধ্যে আসেনি এ শিল্প। যে কোন ভবনেই তৈরি পোশাক কারখানা চালুর সুযোগ রয়েছে। বিল্ডিং কোড মানা হয় না অনেক ক্ষেত্রেই। শ্রমিকদের জন্য কোন আবাসন ব্যবস্থা নেই। অধিকাংশ শ্রমিকরা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বস্তিতে বসবাস করছে। বিষয়গুলো নিয়ে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের আমদানিকারকদেরও অসন্তোষ রয়েছে।


0 মন্তব্য:
Post a Comment
আপনার মতামত দিন