ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সাম্প্রতিক হামলার মধ্য দিয়ে ইসরায়েল কার্যত তার সামরিক শক্তির মহড়া দিয়েছে। আর এর মাধ্যমে নিজেদের শত্রু দেশ ইরানকে সতর্ক করে দেওয়ার আভাসও দিল দেশটি। ব্যাপারটা অনেকটা এমন, ইরানকে মূল লক্ষ্য রেখে গাজায় হামলার মাধ্যমে নিজেদের শক্তি ও সক্ষমতার মহড়া দিয়েছে ইসরায়েল। গতকাল শনিবার রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এমনটাই বলা হয়েছে।
ইসরায়েলের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দীর্ঘ দিন ধরে দাবি করে আসছেন, ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি দিন দিন জোরদার করছে। তাদের আশঙ্কা, ইরান এই কর্মসূচির মাধ্যমে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করে তা দিয়ে ইসরায়েলের ওপর হামলা চালাবে। এ নিয়ে তিনি ইরানের প্রতি হুঁশিয়ারিও উচ্চারণ করেছেন।
স্বাধীন ফিলিস্তিনের দাবিতে যুদ্ধরত হামাসের সঙ্গে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর আট দিনের হামলা-পাল্টা হামলায় ছয় ইসরায়েলি ও ১৬৩ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। মিসরের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসির মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। তাই এই হামলা থেকে নিজেদের পাওয়া না-পাওয়ার হিসাব কষতে বসেছে ইসরায়েল।
ইসরায়েল বলছে, হামলার সময় হামাস যেসব অস্ত্র ব্যবহার করেছে, তার বেশির ভাগই তারা ইরানের কাছ থেকে সংগ্রহ করেছে। সে হিসেবে বলা যায় মাত্র ছয়জন ইসরায়েলির মৃত্যু কর্তৃপক্ষকে এই বার্তা দিয়েছে, অস্ত্রগুলোর কার্যকারিতা খুব বেশি নয়। অথচ ইসরায়েল যেসব অস্ত্র দিয়ে হামলা চালিয়েছে, এতে ১৬৩ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়। এ ক্ষেত্রে নিজেদের তৈরি করা অস্ত্রের কার্যকারিতায় বেশ তৃপ্ত ইসরায়েল।
তবে বিষয়টি নিয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তোলার কিছু নেই বলেই মনে করেন ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো উজি ইলাম। তিনি বলেন, গাজার সঙ্গে অন্য সামরিক পরিবেশের তুলনা চলে না। তাই সেখানকার অভিজ্ঞতাকে ইরান হামলার মহড়া হিসেবে বিবেচনা করা অবিবেচকের মতো কাজ হবে।
ইসরায়েল বলছে, রকেটবিধ্বংসী আইরন ডোম নামে তাদের তৈরি করা নতুন অস্ত্রটি এ হামলায় বেশ সাফল্যের পরিচয় দিয়েছে। আইরন ডোম গাজা থেকে আসা ৪২১টি রকেট ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে। সে হিসাবে সাফল্যের হার ৮৪ শতাংশ।
ইসরায়েলে বিপুল পরিমাণে হতাহতের ঘটনা না ঘটার ক্ষেত্রে এটি আইরন ডোমের সাফল্য বলে মনে করছেন রাজনীতিবিদেরাও। দেশটির পার্লামেন্ট নেসেটের বিরোধীদলীয় এমপি এবং পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষাসংক্রান্ত কমিটির সদস্য ইউহানান প্লেসনার বলেন, আইরন ডোম প্রমাণ করেছে যে এটি যুদ্ধের পরিবেশ বদলে দিতে পারে। সার্বিক বিবেচনায় এ ক্ষেত্রে ইসরায়েল কয়েক বছর এগিয়ে গেল বলেও যোগ করলেন তিনি।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী এহুদ বারাক মনে করেন, আইরন ডোম জোরালো প্রতিরোধ গড়ে তুলে সুরক্ষা দেওয়ার প্রযুক্তিতে ইসরায়েলকে কয়েক বছর এগিয়ে দিয়েছে। পৃথিবীর কোনো সামরিক বাহিনীর কাছে এই প্রযুক্তি নেই দাবি করে তিনি বলেন, ক্রমান্বয়ে এটি ইসরায়েলকে যেকোনো ধরনের হুমকি এবং স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রতিরোধে সুরক্ষা দেবে।
ইরানের কাছে অ্যারো-২ নামে যে আন্তমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র আছে, তা অনেকটা আইরন ডোমের মতো। তবে ইসরায়েলের আইরন ডোম আরেকটু বেশি উচ্চতায় রকেট বিধ্বংস করতে সক্ষম। সে ক্ষেত্রে ইসরায়েলে হামলা চালানোর পরিকল্পনা করলে ইরানকে এই প্রযুক্তি আরও জোরদার করতে হবে বলেও বিশ্লেষকেরা মনে করেন।
ইসরায়েলের মন্ত্রীরা প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা দুই বিভাগে পাওয়া সাফল্য নিয়ে তৃপ্ত। আরেকটি বিষয় এখানে উল্লেখযোগ্য, যুদ্ধবিরতির ক্ষেত্রে মিসরের এগিয়ে আসাকে বড় ধরনের পরিবর্তন মনে করছে ইসরায়েল। মীর জাভেদানফার নামের একজন ইরান বিশেষজ্ঞ বলেন, ইসরায়েল ও মিসরের মধ্যে বর্তমান সম্পর্কটি ইরানের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। মুরসি তাঁর ভূমিকার মধ্য দিয়ে কার্যত ইসরায়েলের সঙ্গে সুসম্পর্কের জানালা খুলে নিলেন।
তবে গাজায় ইসরায়েলের সাফল্য থেকে ইরানের ব্যাপারে এখনো কোনো সিদ্ধান্তে আসার সময় আসেনি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। ইসরায়েলের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জিওরা আইল্যান্ড বলেন, এর কোনো কিছুই ইসরায়েল ও ইরানের সম্ভাব্য সংঘর্ষের ক্ষেত্রে কোনো প্রভাব ফেলবে না।


0 মন্তব্য:
Post a Comment
আপনার মতামত দিন