চট্টগ্রামে দুই ছেলেমেয়েসহ মায়ের খুনের ঘটনা ঘটেছে একটি মুঠোফোনের জন্য। ওই ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া গৃহশিক্ষক তারেক চৌধুরী আজ শুক্রবার সকালে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনারের সম্মেলনকক্ষে সংবাদ সম্মেলনে এই দাবি করেছেন। তবে পুলিশ ও পরিবারের সদস্যরা বলছেন এ ঘটনার পেছনে ভিন্ন কোনো কারন থাকতে পারে।
সংবাদ সম্মেলনে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম ও নিহতদের পরিবারের সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন।
গত মঙ্গলবার বিকেলে নগরের খতিবের হাট এলাকায় ‘মা-মনি ভিলা’ নামের ভবনের পঞ্চম তলায় ছেলে আলভি (১০) ও মেয়ে আদিবাসহ (৫) খুন হন মা ডলি আক্তার। ঘটনার পর থেকেই পুলিশের সন্দেহ ছিল গৃহশিক্ষক তারেকের ওপর। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে তারেককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
আগে দুই শিশুকে হত্যা: তারেক চৌধুরী সংবাদ সম্মেলনে ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘আলভীর আম্মা নিচে যায়। এরপর আলভীকে গলা ধরে রান্না ঘরে নিই। ছুরি দিয়ে চেষ্টা করে কিছু না হওয়ায় দা দিয়ে চার-পাঁচটা কোপ দিই। আদিবা তখন বাথরুমে ছিল। ও বের হয়ে এ ঘটনা দেখে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। এরপর ওকেও গলা টিপে দিই। দা দিয়ে দুয়েকটা কোপ দিই।’
দুই শিশুকে হত্যার পর ঘরের ফ্রিজের পাশে লুকিয়ে ছিলেন তারেক। ডলি আক্তার ফিরে এলে তাঁর মাথায় দা দিয়ে কোপ দেন জানিয়ে তারেক বলেন, ‘কয়েকটা কোপ দিলে মাটিতে পড়ে যায়। তারপর টেনে শরীরটা পড়ার ঘরে নিয়ে আসি। দা দিয়ে মুখে আঘাত করি।’
হত্যাকাণ্ডের কারণ জানতে চাইলে তারেক বলেন, ‘একটা দামি মুঠোফোনের শখ তার অনেক দিনের। যেকোনো উপায়ে ডলি আক্তারের মুঠোফোনটি নেওয়ার জন্য ঘটনার এক দিন আগেই সে পরিকল্পনা করে। ডলি আক্তার নিচে গেলে দুটি মুঠোফোনই সে নিয়ে নেয়। তারপর সে শিশুদের হত্যা করে।’
তারেক আরও বলেন, ‘ছেলেমেয়েদের পড়ানো নিয়েও ডলি আক্তারের প্রতি ক্ষোভ ছিল। উনি বেতন দিতে দেরি করতেন। কতক্ষণ পড়াব সেটা নিয়েও তাঁর (ডলির) আপত্তি ছিল।’
পরিবার ও পুলিশের বক্তব্য: সংবাদ সম্মেলনে কান্নায় ভেঙে পড়েন ডলি আক্তারের আবুধাবিপ্রবাসী স্বামী আনোয়ার হোসেন ও বাবা মোহাম্মদ ইসহাক।
আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমি তাঁর (তারেক) দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। আমার স্ত্রী, সন্তানদের যেভাবে হত্যা করা হয়েছে, সেভাবে যেন তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।’ তবে শুধু মুঠোফোনের জন্য হত্যা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না তারা।
এছাড়া নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘ডলি আক্তারের স্বামী প্রবাসী। প্রবাসীর স্ত্রী হওয়ায় তার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের বাসনা ছিল তারেকের মনে। তা চরিতার্থ করতে না পেরেই এ হত্যাকাণ্ড ঘটাতে পারে। ডলির শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাতের নমুনা দেখে তা-ই ধারণা হচ্ছে।’
পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, স্থানীয় লাইম লাইট স্কুলের শিক্ষিকা শীলা নিহত ডলির
সন্তানদের সকালে পড়ান। বিকেলে পড়ানোর জন্য অন্য একজন গৃহশিক্ষক ঠিক করে দিতে শীলাকে বলেন ডলি। শীলা সনেট নামের একজনকে গৃহশিক্ষক ঠিক করার দায়িত্ব দেন। এরপর তারেককে গৃহশিক্ষক হিসেবে কাজ দেন সনেট। গত এপ্রিল থেকে তারেক গৃহশিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান।
প্রথম দুই মাস বেতন হিসেবে দুই হাজার টাকা করে দিলেও পরে বেতন দিতে গড়িমসি করতেন ডলি। তারেকের দাবি, পড়ানোর সময় ও বেতন কম দেওয়া নিয়ে ডলির ওপর তাঁর ক্ষোভ ছিল।
দায় স্বীকার করে জবানবন্দি: তিনজনকে হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন তারেক। শুক্রবার বিকেলে চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম আলী মনসুরের আদালতে ১৬৪ ধারায় তাঁর জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়।
পাঁচলাইশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রদীপ কুমার দাশ জানান, তারেককে আরো জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। আদালত ২৯ অক্টোবর রিমান্ড আবেদনের শুনানির দিন ধ্যার্য করে তারেককে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
ওসি প্রদীপ কুমার জানান, সকালে সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যই তারেক জবানবন্দিতে বলেছেন।

0 মন্তব্য:
Post a Comment
আপনার মতামত দিন