ছাত্রলীগের তালিকা মেনে কর্মচারী নিয়োগ না করায় কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা কার্যক্রম ২৫ দিন ধরে বন্ধ রয়েছে। দেড় শর মতো পরীক্ষা স্থগিত হয়েছে। এর মধ্যে ছাত্রলীগের কর্মীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সচল সব গাড়ি ভাঙচুর করেছেন। হামলার শিকার হয়েছে চিকিৎসাকেন্দ্রসহ বিভিন্ন দপ্তর।
ছাত্রলীগের এই তৎপরতার সঙ্গে মিলিয়ে একই সময়ে ভাড়া করা ৩১ গাড়ি সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহের বাস মালিক সমিতি। ফলে ১২ হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে বাইরে থাকা নয় হাজার শিক্ষার্থী এবং শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী ক্যাম্পাসে আসতে পারছেন না। আর ক্যাম্পাসে থাকা তিন হাজার শিক্ষার্থী ও শিক্ষক-কর্মকর্তাদের ৫০টির মতো পরিবার আছে চরম আতঙ্কে।
নিয়োগ থেকে শুরু: কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ৯২টি পদে নিয়োগের জন্য প্রায় আট মাস আগে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। প্রায় দুই মাস ধরে মৌখিক পরীক্ষা নিয়ে গত ৮ সেপ্টেম্বর উপাচার্যের বাংলোতে সিন্ডিকেট সভায় নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের তালিকা অনুমোদন করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ৯২টি পদের বিপরীতে ১১২ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে কোনো তালিকা প্রকাশ করা হয়নি। নিয়োগপ্রাপ্তরা কাজেও যোগদান করেছেন বলে প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে।
অভিযোগ উঠেছে, বিভিন্ন পদের জন্য ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক এবং তাদের বিরোধী পক্ষ পৃথকভাবে ২৫০ জনের তালিকা দেয় প্রশাসনকে। কিন্তু নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে এই দুই তালিকা থেকে মাত্র কয়েকজনকে নেওয়া হয়। এর পরই ক্ষিপ্ত ছাত্রলীগের হাতে জিম্মি হয়ে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়। তাদের ভাঙচুরের হাত থেকে রেহাই পায়নি বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্রটিও।
ছাত্রলীগের সভাপতি-সম্পাদকবিরোধী পক্ষের নেতা আলী মর্তুজা খসরু অভিযোগ করেন, ‘ছাত্রলীগের সভাপতি জাহাঙ্গীর হোসাইন ও সাধারণ সম্পাদক শামসুজ্জামান মিলে প্রায় ২০০ জনের তালিকা দিয়েছিল। এ জন্য তারা চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে কয়েক কোটি টাকা নিয়েছে। কিন্তু বেশির ভাগেরই চাকরি হয়নি। এখন তারা ভাঙচুর চালিয়ে ক্যাম্পাসে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এম আলাউদ্দিনও স্বীকার করেছেন, নিয়োগের জন্য একটি তালিকা ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক দিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্য থেকে দু-চারজনের চাকরি হয়েছে।
ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শামসুজ্জামান বলেন, ‘নিয়োগ-বাণিজ্যের সঙ্গে ছাত্রলীগের কোনো সম্পৃক্ততা নেই, বরং বাণিজ্য করেছে প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সংগঠন বঙ্গবন্ধু পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রুহুল কে এম সালেহ বলেন, ‘নিয়োগে ব্যাপক দুর্নীতি, অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, সহ-উপাচার্য ও প্রক্টর বিভিন্ন পদে নিজেদের পছন্দের প্রার্থী নিয়োগ দিয়েছেন। বর্তমান সংকটের এটাই অন্যতম কারণ।’
উপাচার্য এম আলাউদ্দিন গত মুঠোফোনে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোনো নিয়োগ-বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত নয়।’চোরাগোপ্তা হামলা-ভাঙচুর: গত ১০ সেপ্টেম্বর ছাত্রলীগের কিছু নেতা-কর্মী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের অফিস ভাঙচুর করেন। ১২ সেপ্টেম্বর রাতে ঝিনাইদহ ও কুষ্টিয়ায় যাওয়ার পথে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অ্যাম্বুলেন্স ও একটি বাস ভাঙচুর করা হয়। একই দিন দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে ক্যাম্পাসে আবাসিক ভবন এলাকায় রাখা শিক্ষকদের বহনকারী একটি বাসে বোমার বিস্ফোরণ ঘটে এবং বাসটি পুড়ে যায়। ১৩ সেপ্টেম্বর সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ছাত্রলীগ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পক্ষের নেতা-কর্মীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন দপ্তর ভাঙচুর করেন। ১৫ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক থেকে ককটেল, ছোরাসহ বহিরাগত চার ব্যক্তিকে আটক করে পুলিশ। ১৬ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কুষ্টিয়ায় যাওয়ার পথে উপাচার্য ও সহ-উপাচার্যের গাড়িতে ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও ভাঙচুর করা হয়। এতে এক শিক্ষকসহ আটজন আহত হন। ২০ সেপ্টেম্বর কুষ্টিয়া শহর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার পথে লক্ষ্মীপুরে কোষাধ্যক্ষ ও শিক্ষকদের গাড়িতে হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। সর্বশেষ ৩০ সেপ্টেম্বর ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি বাস ও প্রশাসনিক ভবনের কয়েকটি কক্ষ ভাঙচুর করেন। এসব ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় তিন কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হয়েছে বলে কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে।
পরিবহন: কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহ উভয় জেলা শহর থেকেই প্রায় ২৪ কিলোমিটার দূরে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়। ১২ হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় তিন হাজার থাকেন আবাসিক হলগুলোতে। বাকি প্রায় নয় হাজার শিক্ষার্থী কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহ শহরে থাকেন। তাঁদের ক্যাম্পাসে আসা-যাওয়ার একমাত্র মাধ্যম বাস। শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বড় অংশও থাকে এই দুই শহরে। তাদের যাতায়াতের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের আছে মাত্র ১২টি বাস। ছাত্রলীগের হামলায় এর ১০টিই এখন অচল। বাকি যে ৩১টি বাস ভাড়া নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়কে সচল রাখা হতো, কাকতালীয়ভাবে ৯ সেপ্টেম্বর থেকে এই বাসমালিকেরাও বিশ্ববিদ্যালয়কে গাড়ি দেওয়া বন্ধ করে দেন। অচল হয়ে যায় বিশ্ববিদ্যালয়। অভিযোগ পাওয়া গেছে, ভাড়া করা বাস বন্ধ করে দেওয়ার পেছনে ছাত্রলীগের হাত আছে। ছাত্রলীগের এক নেতার চাচা কুষ্টিয়া বাস মালিক সমিতির নেতা। সেই সূত্রেই ছাত্রলীগের ‘নিয়োগ-প্রতিবাদের’ সঙ্গে এই বাসমালিকদের ‘বিরতি’ মিলে যায়। তবে কুষ্টিয়া বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবুল ফজল বলেন, ‘ক্যাম্পাসের অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে বাসের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কায় বাস সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তিনিও বলেন, ‘কিছুদিন আগে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আমাদের ২০ শতাংশ ভাড়া বাড়ানোর সমঝোতা হয়েছিল। কিন্তু এ ব্যাপারে তারা এখনো কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।’ তবে উপাচার্য বলেন, তিন মাস আগেই ভাড়া ২০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। এখন আবার ভাড়া বৃদ্ধির চাপ দিয়ে অহেতুক বিশ্ববিদ্যালয়কে অচল করে রাখা হয়েছে। অচল শিক্ষা কার্যক্রম: ২৫ দিন ধরে অঘোষিতভাবে বন্ধ রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম। এই সময়ে কোনো বিভাগেই কোনো ক্লাস হয়নি। স্থগিত করা হয়েছে ২২টি বিভাগের দেড় শতাধিক পরীক্ষা। ইংরেজি বিভাগের ছাত্রী সায়মা সুলতানা বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে এসে এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন কোনো দিন হইনি। নিয়োগকেন্দ্রিক সমস্যার কারণে আমরা কেন ভুক্তভোগী হব?’ ইতিহাস বিভাগের ছাত্র মো. শাহীন আজম জানান, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ক্যাম্পাস খুলতেও পারছে না, আবার একেবারে বন্ধ ঘোষণাও করছে না।
উপাচার্য, সহ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষের পদত্যাগ দাবি: বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য গতকাল বুধবার সাধারণ সভা করেছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি। সমিতির সভাপতি এম ইয়াকুব আলীর সভাপতিত্বে সভায় ১৩০ জন শিক্ষক উপস্থিত ছিলেন। সভা শেষে ইয়াকুব সাংবাদিকদের বলেন, উপাচার্য, সহ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষের কারণে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষক সমিতির সদস্যরা তাঁদের পদত্যাগ দাবি করেছেন। সভায় সাত দফা দাবি গৃহীত হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: উপাচার্য, সহ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষকে ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা, তাঁদের অনিয়ম-দুর্নীতির বিচার বিভাগীয় তদন্ত, বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় অবৈধ নিয়োগ বাতিল করা ইত্যাদি।
তাঁরা কেউ ক্যাম্পাসে থাকেন না: বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, সহ-উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষ, প্রক্টর, ছাত্র উপদেষ্টা, রেজিস্ট্রার ও প্রধান প্রকৌশলী ক্যাম্পাসে থাকেন না। ওই সব পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে অবস্থান করা প্রধান শর্ত হলেও তাঁরা থাকেন কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহ শহরে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এসব শীর্ষ ব্যক্তি ক্যাম্পাসের বাইরে থাকায় জরুরি কোনো পরিস্থিতিতে তাঁদের পাওয়া যায় না। শিক্ষক-কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থীরা মনে করেন, তাঁরা ক্যাম্পাসে অবস্থান করলে হয়তো বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি এত খারাপ হতো না। গত ২৫ দিনে উপাচার্য ক্যাম্পাসে গিয়েছেন মাত্র তিন দিন, তাও পুলিশি পাহারায়। একবার হামলার পর এখন উপাচার্যের গাড়ি রাখা হয় পুলিশ লাইনে।

0 মন্তব্য:
Post a Comment
আপনার মতামত দিন