![]() |
| আবুল মাল আবদুল মুহিত |
নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, গতকাল চীনে যাওয়ার আগে দ্বিতীয় দফায় তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে পদত্যাগের ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। দুর্নীতির অভিযোগে পদ্মা সেতুর অর্থায়ন থেকে বিশ্বব্যাংকের সরে দাঁড়ানো ও পরবর্তী সময় হলমার্ক বিতর্ক নিয়ে সংসদ এবং ক্যাবিনেটে তীব্র সমালোচনায় তিনি খুবই ক্ষুব্ধ হয়েছেন। মন্ত্রিপরিষদের কয়েকজন সিনিয়র সদস্যের সঙ্গে তিনি পদত্যাগের ব্যাপারে আলোচনা করেছেন। গত রোববার সচিবালয়ে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদেরও তিনি বলেছেন, ‘অনেকদিন থেকে আমি পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি। কিন্তু ইচ্ছা করলেও সব হয় না।’ তিনি বলেন, ‘আমি নয় মাস ধরে চেষ্টা করছি টু গেট আউট।’
অর্থমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা যায়, সরকারের প্রভাবশালীদের কারণে শেয়ারবাজারে লুটতরাজ, পদ্মা সেতুর দুর্নীতি, ডেসটিনি ও হলমার্কের কেলেঙ্কারির বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেননি। এতে তিনি বেশ মনঃক্ষুণ্ন। বিশেষ করে পদ্মা সেতু ও হলমার্ক কেলেঙ্কারিতে প্রধানমন্ত্রীর দু’জন উপদেষ্টার জড়িয়ে পড়ার ঘটনায় তিনি বিব্রত। উপদেষ্টা মসিউর রহমান পদত্যাগ না করায় সেতুতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। হলমার্কের ঋণ কেলেঙ্কারিতে প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য উপদেষ্টা সৈয়দ মোদাচ্ছেরের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠায় দ্বিতীয় দফায় তিনি রুষ্ট হন। বিভিন্ন মহল থেকে উপদেষ্টা দু’জনের পদত্যাগ দাবি উঠলেও তারা পদত্যাগ করেননি। উল্টো সরকারের শীর্ষ মহলের কঠোর আক্রমণের শিকার হন। বিশেষ করে সংসদ ও কেবিনেটের শীর্ষ ব্যক্তিদের কঠোর তোপের মুখে পড়েন তিনি। এসব কারণে তার পরিবার ও ঘনিষ্ঠজনদের পক্ষ থেকে তাকে পদত্যাগের পরামর্শ দেওয়া হয়। তিনি নিজেও মনে করেন চলমান পরিস্থিতিতে পদ আঁকড়ে থাকার প্রয়োজন নেই।
এদিকে সরকারের প্রভাবশালী শীর্ষ কয়েকজন ব্যক্তি সাম্প্রতিক কিছু বিষয় নিয়ে অর্থমন্ত্রীর ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন। বিভিন্ন ঘটনায় অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য সরকারকে বিব্রত করেছে বলে মনে করেন সরকারের শীর্ষ ব্যক্তিরা। বিশেষ করে শেয়ারবাজারে ধস, ড. ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংক, ডেসটিনি ও হলমার্ক কেলেঙ্কারি নিয়ে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য সরকারের নীতির পরিপন্থী, যা সরকারের ইমেজ সঙ্কট তৈরি করেছে বলে মনে করছেন সরকারের নীতিনির্ধারকরা।
প্রসঙ্গত, সোনালী ব্যাংকের ঋণ কেলেঙ্কারি নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের সমালোচনা করে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছিলেন, তিন-চার হাজার কোটি টাকা এমন কিছু নয়। তিনি এ কথাও বলেন, মামলা করলে টাকা আদায় অনিশ্চিত হয়ে যেতে পারে বলে হলমার্কের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে না। তার ওই বক্তব্যের পর জাতীয় সংসদে সমালোচনার ঝড় উঠলে গত বৃহস্পতিবার নিজ বক্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন অর্থমন্ত্রী।
এদিকে পরিস্থিতি যখন ক্রমেই তিক্ততার দিকে যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তখন বলেন, অর্থমন্ত্রী এসব ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে অর্থমন্ত্রী অস্বস্তিকর অবস্থায় আছেন। এই অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে তিনি মাঝে মধ্যেই দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর কথা ভেবেছেন। তবে সম্প্রতি কয়েকটি ঘটনায় এই ইচ্ছা প্রবল হয়ে উঠেছে। বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনায় কিছুটা অগ্রগতির পর গত মাসের তৃতীয় সপ্তাহে তিনি প্রধানমন্ত্রীকে তা অবহিত করেন। বলেন, শর্ত অনুসারে অর্থ উপদেষ্টা মসিউর পদত্যাগ করলেই বাতিল করা ঋণচুক্তি পুনর্বহাল করবে বিশ্বব্যাংক। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী বিষয়টিতে সায় না দিয়ে বলেন, পদত্যাগের বিষয়টি মসিউর নিজে ঠিক করবে। পদ্মা সেতু ইস্যুতে তীরে এসে তরী ডোবার উপক্রম থেকে মন্ত্রী চরম হতাশ হন। পরদিন তিনি অফিসও করেননি। এতে তার পদত্যাগের গুজব ছড়িয়ে পড়ে।
গত সপ্তাহে কেবিনেটে বস্ত্রমন্ত্রী তীব্র ভাষায় অর্থমন্ত্রীকে আক্রমণ করেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী বস্ত্রমন্ত্রীকে থামানোর চেষ্টা করেননি। বরং বলেন, বড় ভাই হিসেবে তিনি যেন সব সহজভাবে নেন। এতে মারাত্মকভাবে মর্মাহত হন মুহিত।
অর্থমন্ত্রী একাধিকবার মৌখিকভাবে পদত্যাগের আগ্রহ দেখালেও তাতে সাড়া দিচ্ছেন না প্রধানমন্ত্রী। আগামীতেও সাড়া দেওয়ার সম্ভাবনা নেই। কারণ তার পদত্যাগ সরকারকে বেশ বিব্রতকর অবস্থায় ফেলতে পারে। অর্থমন্ত্রীকে নিয়ে নানা বিতর্ক থাকলেও তার সততা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। তাই তার পদত্যাগে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে। অন্যদিকে তিনি বৃহত্তর সিলেটের মন্ত্রী। তাই তার পদত্যাগ আগামী নির্বাচনে দলের ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এদিকে মসিউর রহমান গত ৭ সেপ্টেম্বর ভারত সফর শেষে দেশে ফিরে সাংবাদিকদের বলেন, বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণ না দিলে তিনি পদত্যাগ করবেন না। এর আগে তিনি বলেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী চাইলে তিনি পদত্যাগ করবেন। জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী নিজেও চান না মসিউর রহমান পদত্যাগ করুন।
অন্যদিকে সরকারের শীর্ষ মহল থেকে হলমার্ক কেলেঙ্কারিতে স্বাস্থ্য উপদেষ্টা ডা. সৈয়দ মোদাচ্ছের আলীর পদত্যাগের কথা উঠলেও এখন সেটা চাপা পড়ে গেছে। জানা গেছে, সরকারের শীর্ষ মহলের হস্তক্ষেপে মোদাচ্ছের রেহাই পেয়ে যাচ্ছেন।
উল্লেখ্য, বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ওয়ার্ল্ড ইকনোমিক ফোরাম) সভায় যোগ দিতে গত সোমবার সাত দিনের সফরে চীন গেছেন অর্থমন্ত্রী। ১১ সেপ্টেম্বর থেকে চীনের তিয়ানজিনে ফোরামের তিন দিনব্যাপী বার্ষিক সভা চলবে। সভা শেষে ১৩ সেপ্টেম্বর রাতে মন্ত্রী চীনের রাজধানী বেইজিং যাবেন। ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি সেখানে থাকবেন। চীনে অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি পদ্মা সেতুর অর্থায়ন জটিলতা নিয়ে বিশ্বব্যাংকসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠকের চেষ্টা করবেন অর্থমন্ত্রী। চীন থেকে ফিরে পদত্যাগের বিষয়ে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করবেন বলে জানা গেছে।


0 মন্তব্য:
Post a Comment
আপনার মতামত দিন