পদ্মা সেতু প্রকল্পে অর্থায়নে নতুন করে যুক্ত হওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।গতকাল শুক্রবার (বাংলাদেশ সময়) সকালে ওয়াশিংটন থেকে বিশ্বব্যাংকের পাঠানো এক বিবৃতিতে এ ঘোষণা দেওয়া হয়। তাতে বলা হয়, বাংলাদেশ সরকার বিশ্বব্যাংকের দেওয়া চারটি শর্ত পূরণ এবং ভবিষ্যতে স্বচ্ছতার সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নে সম্মত হওয়ায় পদ্মা সেতু নির্মাণের প্রক্রিয়ায় বিশ্বব্যাংক নতুন করে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বহুজাতিক এই দাতা সংস্থার বিবৃতিতে এ-ও বলা হয়, ‘বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু প্রকল্পে যেকোনো ধরনের দুর্নীতির ব্যাপারে ছাড় দেবে না। যেকোনো অবৈধ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আমাদের কঠোর অবস্থানের কখনো পরিবর্তন হবে না।’ বিশ্বব্যাংকের এই সিদ্ধান্তের ফলে পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে প্রায় এক বছর ধরে চলে আসা জটিলতার অবসান হলো। তবে এ ব্যাপারে গতকাল পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দেয়নি। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত গতকাল সকালে সাংবাদিকদের বলেন, এ কাজে ওয়াশিংটনে অবস্থানরত বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল দেশে ফিরলে সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া হবে। এদিকে যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গতকাল সিরাজগঞ্জে সাংবাদিকদের বলেছেন, বিশ্বব্যাংকের সিদ্ধান্তে পদ্মা সেতু নির্মাণে অর্থায়নের অনিশ্চয়তা কাটতে শুরু করেছে। দুই পক্ষের মধ্যে কিছু পদ্ধতি ও প্রক্রিয়াগত কাজ করতে হবে। এ জন্য কিছুদিন সময়ের প্রয়োজন হবে। পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ এনে এবং সন্দেহভাজনদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ায় গত ২৯ জুন ১২০ কোটি মার্কিন ডলারের (নয় হাজার ৬০০ কোটি টাকা) ঋণচুক্তি বাতিল করেছিল বিশ্বব্যাংক। এর আগে অর্থ পাওয়ার পূর্বশর্ত হিসেবে দুর্নীতির জন্য সরকারের সন্দেহভাজন মন্ত্রী, উপদেষ্টা ও উচ্চপর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তাকে সরানোসহ চারটি শর্ত দিয়েছিল বিশ্বব্যাংক। চুক্তি বাতিলের কারণ, চার শর্ত ও ফিরে আসা: পদ্মা সেতু প্রকল্পে ঋণচুক্তি বাতিলের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে বিশ্বব্যাংকের গতকালের বিবৃতিতে বলা হয়, বিশ্বব্যাংকের তদন্ত দল পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ বাংলাদেশ সরকারের কাছে দিয়েছিল। প্রকল্পে অর্থায়ন ঠিক রাখার জন্য বিশ্বব্যাংক সুস্পষ্ট ও সুর্নিদিষ্ট পদক্ষেপ চিহ্নিত করেছিল। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার সেগুলো পূরণ করতে পারেনি। এর মধ্যে রয়েছে: (ক) যেসব সরকারি কর্মকর্তা ও ব্যক্তির (আমলা ও রাজনৈতিকভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত) বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সরকারি দায়িত্ব থেকে তাঁদের ছুটিতে পাঠানো; (খ) অভিযোগ তদন্তে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একটি বিশেষ তদন্ত দল নিয়োগ করা; (গ) আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত বিশ্বব্যাংকের নিয়োগকৃত একটি প্যানেলের কাছে তদন্তসংশ্লিষ্ট সব তথ্যের পূর্ণ ও পর্যাপ্ত প্রবেশাধিকার, যাতে এই প্যানেল সুষ্ঠু তদন্ত ও এর অগ্রগতি সম্পর্কে উন্নয়ন সহযোগীদের নির্দেশনা দিতে পারে এবং (ঘ) পদ্মা সেতু প্রকল্পটি বিকল্প বাস্তবায়ন পদ্ধতিতে নির্মাণের বিষয়ে একমত হওয়া, যাতে বিশ্বব্যাংক ও অন্য দাতারা প্রকল্পের ক্রয় কর্মকাণ্ড আরও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের সুযোগ পায়। পদ্মা সেতু প্রকল্পে অর্থায়নে নতুন করে রাজি হওয়ার বিষয়েও বিশ্বব্যাংক নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছে। তাতে বলা হয়, ‘ঋণ বাতিলের পর বাংলাদেশ সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। দুর্নীতির যে প্রমাণ বিশ্বব্যাংক চিহ্নিত করেছে, তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সরকার ব্যবস্থা নেওয়া শুরু করেছে। বিশ্বব্যাংক মনে করে, প্রকল্পে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত সন্দেহভাজন সব সরকারি ব্যক্তিকে (আমলা ও রাজনৈতিকভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত) তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব থেকে ছুটি দেওয়া হয়েছে এবং একটি অবাধ ও সুষ্ঠু তদন্ত চলছে।’ যেসব শর্ত পালন করতে হবে: বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, বিশ্বব্যাংক যে চারটি শর্ত দিয়েছিল, এর মধ্যে সন্দেহভাজন মন্ত্রী, উপদেষ্টা ও সরকারি কর্মকর্তাদের সরানোর শর্ত এরই মধ্যে পূরণ করা হয়েছে। বাকি শর্তগুলো মানার ব্যাপারেও বাংলাদেশ সরকার সম্মত হয়েছে, যা দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত থেকে শুরু করে প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায়ে পূরণ করতে হবে। বিশ্বব্যাংকের বিবৃতিতে বলা হয়, ‘এসব পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানানোর সময় বাংলাদেশ সরকার বিশ্বব্যাংককে পদ্মা বহুমুখী সেতুতে অর্থায়নের বিষয়টি পুনর্বিবেচনার অনুরোধ করে। সরকার পূর্বশর্ত হিসেবে কিছু প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণেও সম্মত হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে: সেতুর নির্মাণকাজে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য প্রকল্পে নতুন ক্রয়ব্যবস্থায় অধিকতর ও নিবিড় পর্যবেক্ষণের সুযোগ; সুষ্ঠু, অবাধ ও দ্রুত তদন্তকাজ চালিয়ে যাওয়া; তদন্ত পর্যালোচনা করে সরকার ও বিশ্বব্যাংকের কাছে এ-সংক্রান্ত তথ্য প্রদানের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত স্বাধীন ব্যক্তিদের নিয়ে একটি দল গঠন।’ বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধিদল আসবে: বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, পরবর্তী করণীয় ঠিক করতে বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিনিধিদল শিগগির ঢাকায় আসবে। বিশ্বব্যাংকের শর্ত অনুযায়ী, দুদকের তদন্তের ফলাফল বিশ্বব্যাংকের নিয়োগ করা বিশেষজ্ঞ দলকে অবহিত করতে হবে। এর জন্য একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হবে। প্রস্তাবিত সমঝোতা স্মারকের খসড়াও তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া পদ্মা সেতু প্রকল্পের প্রতিটি দরপত্রের প্রক্রিয়ায় সরাসরি বিশ্বব্যাংকসহ অর্থায়নকারী অন্য সংস্থাগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করার শর্ত সরকার মেনে নিয়েছে। বিশ্বব্যাংকসহ অন্যান্য সংস্থা কীভাবে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হবে, তা বিশ্বব্যাংক প্রতিনিধিদলের ঢাকা সফরের সময় চূড়ান্ত হওয়ার কথা রয়েছে। প্রসঙ্গত, এর আগে দাতাদের সহযোগিতায় নির্মিত অবকাঠামো প্রকল্পে সরকার দরপত্র আহ্বান ও তা মূল্যায়ন করে দাতাদের অনুমোদন নিত। এবার দাতাদের সরাসরি সম্পৃক্ত করার শর্ত দেওয়া হয়েছে।

0 মন্তব্য:
Post a Comment
আপনার মতামত দিন