মিজানুর রহমান খান, ওয়াশিংটন ডিসি থেকে:দিল্লিতে ২ ডিসেম্বর ব্রিটিশ হাইকমিশনার স্যার টেরেন্স গার্ভি হন্তদন্ত হয়ে সাক্ষাৎ করেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত কেনেথ কিটিংয়ের সঙ্গে। আর ওয়াশিংটনে কিসিঞ্জার নিক্সনকে এক স্মারকে বলেন, পূর্ব পাকিস্তান সীমান্তজুড়ে গেরিলা তৎপরতা ও ভারতীয় আক্রমণ বেগবান হচ্ছে। জাতিসংঘ তুলনামূলকভাবে স্থবির। পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূত ইঙ্গিত দিচ্ছেন, তিনি ৩ ডিসেম্বরের মধ্যেই নিরাপত্তা পরিষদে যেতে নির্দেশনা পেতে পারেন। চীন পাকিস্তানের পক্ষ হয়ে ভেটো প্রয়োগ করবে, আর সোভিয়েতরা ভারতের পক্ষে দাঁড়াবে। চীন সব সময়ই পাকিস্তানের পক্ষে কথা বলছে। অন্যদিকে অস্ত্র বিক্রির মার্কিন সিদ্ধান্ত সম্পর্কে ভারত বলেছে, এই অধিকার ওয়াশিংটনের আছে।
উল্লেখ্য, সিনিয়র জর্জ বুশ একাত্তরে বর্তমানের সুসান রাইসের মতো জাতিসংঘে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ছিলেন। বুশ পররাষ্ট্র দপ্তরকে (তারবার্তা নম্বর-৪৭১২) জানান, জাতিসংঘে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত আগা শাহি তাঁকে বলেন, তিনি তাঁর সরকারকে পরামর্শ দিয়েছেন যে, এখন যদি পাকিস্তান নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক ডাকে, তাহলে সেখানে পাকিস্তান-ভারত ও চীন-সোভিয়েতের মধ্যে বড় ধরনের বিরোধ দেখা দেবে। পাকিস্তান এখন পূর্ব পাকিস্তানে জাতিসংঘ পর্যবেক্ষক নিয়োগের বিষয়টি রফা করতে চাইছে। তারা সীমান্তের উভয় পাশে ২০ জন পর্যবেক্ষক নিয়োগ চায়। সে জন্য আগা শাহি নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতির সঙ্গে একান্ত বৈঠক করতে চান। এ রকম ‘অবিতর্কিত বিষয়ে’ যদি মতৈক্য না হয়, তাহলে নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকই ডাকা হবে। তখন ভুট্টো সেখানে কট্টর ভারতবিরোধী ভূমিকা নেবেন।
অবশ্য বুশ মন্তব্য করেছিলেন, শাহি বর্ণিত সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের প্রয়াস অকার্যকর হতে বাধ্য। অভিজ্ঞ পাকিস্তানি কূটনীতিক জানেন, সোভিয়েত ও পোলিশ বিরোধিতার কারণে পর্যবেক্ষক নিয়োগের উদ্যোগ ভেস্তে যাবে। ভারত এখন রাজনৈতিক সমঝোতা-সংক্রান্ত জাতিসংঘের কোনো প্রস্তাবেও রাজি হবে না। এদিকে দিল্লিতে কিটিং-গার্ভি পাকিস্তান-ভারতের আসন্ন যুদ্ধের আশঙ্কায় পুরো পরিস্থিতি খতিয়ে দেখেন। চীনারা যে একাত্তরে পাকিস্তানকে শুধু ঝাঁজালো কথামালার সাহায্যই দিয়েছিল, সেটা যুক্তরাষ্ট্রের মতো অন্যদেরও অজানা ছিল না। এদিন এ বিষয়ে কিটিং যখন প্রশ্ন করেন, তখন স্যার গার্ভি বলেন, ‘ব্রিটেনের প্রতিবেদনগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ভুট্টোর সাম্প্রতিক পিকিং সফর বাইরে যতটা মনে হচ্ছে, তার চেয়ে অনেক বেশি নিরুৎসাহমূলক হয়েছে।’
কিটিং লিখেছেন, গার্ভি মনে করেন, ইন্দিরা গান্ধীর দিকে তাকিয়ে তো কোনো ভরসা দেখা যাচ্ছে না। যদিও গার্ভি ছয় দিন ধরে সেই চেষ্টা করেছেন। তাঁর কথায়, ভারতীয় সেনারা পূর্ব পাকিস্তানে ‘সম্পূর্ণ আত্মরক্ষামূলকভাবে অনাহূত প্রবেশ’ বজায় রাখছে। এর ফলে তাদের কঠোর মনোভাবের পরিচয় ঘটছে। এর আগের ১০ দিনের চেয়ে দিল্লির মনোভাবে যে পরিবর্তন ঘটেছে, তা স্পষ্ট। গার্ভি বলেন, ‘এতে বিশ্ব জনমত ভারতের প্রতিকূলে চলে যাবে। ভারতীয়দের মনস্তত্ত্বে এখন অনেকটা প্রাক্ সুয়েজ সংকটের আলামত মিলছে। এ রকম অবস্থায় তৃতীয় পক্ষের কী-ই বা করার থাকবে, সেটা ধারণা করা দুরূহ।’
গার্ভি আরও বলেন, লন্ডনের পত্রিকা বলেছে, ভারতের উচিত নিজের জাতীয় স্বার্থ দেখা। তথাকথিত বৃহৎ শক্তির ইচ্ছাপূরণে তার চালিত হওয়া উচিত নয়।
কিটিং লিখেছেন, ‘আমি এ সময় তাঁকে ইন্দিরা গান্ধীর সাম্প্রতিক মনোভাব সম্পর্কে ধারণা দিই। আমি বুঝে গেছি যে, তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে ভারতীয় স্বার্থ বড় করে দেখতেই উদ্গ্রীব। আজ সকালেই আমি ভারতের পররাষ্ট্রসচিব টি এন কাউলের সঙ্গে দেখা করি। বিষয় ছিল ভারতে মার্কিন অস্ত্র বিক্রির ছাড়পত্র বাতিল করার সিদ্ধান্ত। আমাদের কথোপকথন সম্পর্কে আমি তাঁকে কিছুটা আভাস দিই। আমার প্রশ্নের জবাবে গার্ভি বলেন, ইসলামাবাদে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার গত ১৫ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথের চিঠি ইয়াহিয়ার কাছে পৌঁছে দেন। হিথ তাঁর চিঠিতে নির্দিষ্টভাবে মুজিবের মুক্তি দাবি করেছেন। এবং তাঁর সঙ্গেই সংলাপে বসতে সুপারিশ করেছেন। কিন্তু ইয়াহিয়া তাঁর প্রতি নিষ্ক্রিয় থাকেন।’
উল্লেখ্য, একাত্তরের এই সময়টায় বৃহৎ শক্তিগুলো মুজিবের মুক্তি ও তাঁর সঙ্গে রাজনৈতিক সংলাপের বিষয়ে পাকিস্তানকে অব্যাহতভাবে চাপ দিচ্ছিল। এমনকি ব্রিটেনের মতো মার্কিন মিত্ররাও ওয়াশিংটনের কাছ থেকে দূরে সরছিল। কিন্তু নিক্সন-কিসিঞ্জার এর সঙ্গে সুর মেলাননি।
কিটিং লিখেছেন, ‘আমি এ সময় গার্ভিকে বলি যে, মার্কিন সরকার কখনোই শেখ মুজিবকে মুক্তি দিতে বলেনি। তবে একটা রাজনৈতিক আপসের লক্ষ্যে ইয়াহিয়ার সরকার ও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের মধ্যে তারা একটা সংলাপ চালাতে ইয়াহিয়াকে উৎসাহিত করছে।’
দিল্লিতে ইতালির নবনিযুক্ত রাষ্ট্রদূত অ্যামেদি গুলেত মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে দেখা করেন। তিনি বলেন, তাঁর সরকারও মুজিবকে মুক্তি দিতে ইয়াহিয়াকে বলে নিরাশ হয়েছে। ভারতের উদ্বাস্তু সমস্যার প্রতি রোম সহানুভূতিশীল, কিন্তু পাকিস্তানি ভূখণ্ডে ভারতীয় সেনার অনুপ্রবেশে তারা মনঃক্ষুণ্ন।
ঢাকার মার্কিন কনস্যুলেট আজ রিপোর্ট দিয়েছে যে, পাকিস্তান সেনাবাহিনী সীমান্তে ক্রমেই গভীর সংকটে পড়ছে। তবে ভারতীয়রা পূর্ব পাকিস্তানের ভূখণ্ড দখল করে নেওয়ার যে অভিযোগ পাকিস্তানি সূত্রগুলো করছে, সেটা অতিরঞ্জিত। কারণ, মুক্তিবাহিনীর লক্ষ্যের সঙ্গে ভারতীয় সেনাদের পার্থক্য আছে। ভারতীয়দের প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে, পাকিস্তানি সেনাদের হয়রানি করা, ভূখণ্ড করতলগত করা নয়।
আঙ্কারায় মার্কিন দূতাবাসের পলিটিক্যাল কাউন্সিলর সেখানকার ব্রিটিশ হাইকমিশনের উপপ্রধান এডমন্ডসকে নিয়ে সেন্টোর (ন্যাটোর মতো) ডেপুটি সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাকিম্যানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। কারণ, পাকিস্তান এই প্রতিরক্ষা জোটকে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঠেকানোর কাজে ব্যবহার করতে তৎপর হলেও জোটের সদস্যরা একমত হতে পারেননি। আঙ্কারার মিশন ওয়াশিংটনকে এক তারবার্তায় (নম্বর ৮২১২) জানায়, লন্ডন থেকে এডমন্ড নেতিবাচক উত্তর পেয়েছেন। সেন্টো প্রতিনিধিকে মার্কিন কূটনীতিক জানিয়ে দেন, বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানকে জড়ানো হলে তাতে জটিলতা আরও বাড়বে।
তবে লক্ষণীয় যে, এদিন সেন্টো-বিষয়ক একটি রেডিও কপি মার্কিন কাউন্সিলর অ্যাকিম্যানের কাছে হস্তান্তর করেন। গোপন বেতার ‘আওয়ার রেডিও’ ৩০ নভেম্বর বলেছে, ইঙ্গ-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী শক্তি সেন্টোর মাধ্যমে পাকিস্তানের পক্ষে তুর্কি সহানুভূতি আদায়ের চক্রান্ত করছে।’ তুরস্কের রাজধানীতে ছিল এর সদর দপ্তর। ১৯৭৯ সালে এর বিলুপ্তি ঘটে।

0 মন্তব্য:
Post a Comment
আপনার মতামত দিন