
শত শত বছর ধরে চলে আসা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ভিয়েতনামের জন্ম। কখনও চীন, কখনও ফ্রান্স, কখনও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হয়েছে ভিয়েতনামের জনগণকে।
বার বার চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে যায় দেশটি। দীর্ঘ যুদ্ধের মধ্য দিয়ে চীনা শাসন থেকে ভিয়েতনাম মুক্ত হলেও আবার ফ্রান্সের দখলে চলে যায় দেশটি। ১৯৫৪ সালে ফ্রান্সকে পরাজিত করে স্বাধীন হয় ভিয়েতনাম।
কিন্তু ১৯৬৯ সালে শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের চেয়েও বেশি বোমা ফেলে ভিয়েতনামে। যুক্তরাষ্ট্র পরীক্ষামূলকভাবে ভিয়েতনামে রাসায়নিক বোমার আক্রমণও চালায়। বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকা এই যুদ্ধের তীব্রতা ও ভয়াবহতা ফ্রান্স-চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধকেও সহজে হার মানায়।
যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে মরণপণ যুদ্ধ করে ১৯৭৫ সালে ভিয়েতনাম পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা অর্জন করে। এই যুদ্ধে ৩২ লাখ ভিয়েতনামি নাগরিক প্রাণ হারায়। পাশাপাশি ভিয়েতনাম যুদ্ধে নিহত হয় ৫৮ হাজার মার্কিন সেনা।
আধুনিক সমরাস্ত্রে সজ্জিত পরাক্রমশালী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সেই স্মৃতি চিহ্ন বহন করে চলেছে রাজধানী হ্যানয়ের প্রাণ কেন্দ্রে অবস্থিত ভিয়েতনামের সামরিক জাদুঘর।
Vietnam
এই জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে যুদ্ধে শত্রুপক্ষের ব্যবহৃত বিমান, ট্যাঙ্ক, কামানসহ আধুনিক যুদ্ধাস্ত্র। শত্রুপক্ষের ব্যবহৃত অস্ত্র-শস্ত্রের পাশাপাশি এই যুদ্ধে ভিয়েতনামের জনগণের ব্যবহৃত অস্ত্রও সংরক্ষিত আছে। জাদুঘরের বিশাল উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ ঘিরে সংরক্ষণ করা হয়েছে এসব সমরাস্ত্র।
জাদুঘরের ভেতরে বিভিন্ন কক্ষে সংরক্ষিত আছে যুদ্ধের ক্ষত চিহ্ন এবং শত্রু পক্ষের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধে ভিয়েনামের জনগণের বিভিন্ন রণ কৌশলের চিত্র।
সামরিক জাদুঘরের প্রবেশ মুখেই উন্মুক্ত খোলা জায়গায় সংরক্ষিত রয়েছে মিগ-২১ যুদ্ধ বিমান। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছ পাওয়া এই যুদ্ধ বিমানটি যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ বিমানের বিরুদ্ধে পাল্টা আক্রমণ চালায় ভিয়েতনামীরা। এই মিগ-২১ বিমানটি যুক্তরাষ্ট্রের ১৪টি যুদ্ধ বিমান ধ্বংস করে।
বিমানটির পাশে রাখা একটি ফলকে এ তথ্যটি লিখে রাখা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ২ নভেম্বর থেকে তিন দিনের সফরকালে জাদুঘর পরিদর্শনে গেলে দেশটির সামরিক বাহিনীর একজন মেজর শেখ হাসিনা কাছেও এ তথ্য তুলে ধরে যুদ্ধের বিভিন্ন বিবরণ দেন।
এর পর জাদুঘর চত্বরের বাম পাশে সাড়িবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে ভিয়েতনাম যুদ্ধে বিদ্ধস্ত মার্কিন সামরিক বিমানগুলো। কয়েকটি ভাগে রাখা হয়েছে বিধ্বস্ত মার্কিন বাহিনীর ট্যাঙ্ক ও কামান।
বিধ্বস্ত ও ক্ষত-বিক্ষত এই সব অত্যাধুনিক সমরাস্ত্রই ভিয়েতনাম যুদ্ধের তীব্রতা ও ভয়াবহতা সাক্ষি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
ভিয়েতনামের সামরিক জাদুঘর পরিদর্শনের সময় প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গীদের অনেকর মুখে শোনা য়ায়-এটা সামরিক জাদুঘর নয়, যেনো সামরিক ঘাঁটি।
অধিকাংশ মানুষের ধর্মবিশ্বাস নেই। তবে এখানকার তিনটি প্রধান ধর্ম বৌদ্ধ, কনফুসিয়াসবাদ ও দাওবাদ।
ধর্মের প্রতি জনসাধারণের তেমন একটা আকর্ষণ না থাকলেও ধর্মীয় সংস্কৃতির উপর কোনো বিদ্বেষ নেই সরকার ও রাষ্ট্রের। ধর্মীয় সংস্কৃতি সংরক্ষণের ব্যাপারে রাষ্ট্রের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে।
ভিয়েতনাম সফরের তৃতীয় দিনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হ্যানয় শহর থেকে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার দুরে নিহ বিন সিটিতে বিশ্বের বৃহত্তম বৌদ্ধ প্যাগোডা বাই দিন পরিদর্শনে যান।
বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী অধ্যুষিত এই পাহাড়ি অঞ্চলকে ঐতিহাসিক ঐতিহ্য হিসেবে সংরক্ষণের জন্য ভিয়েতনাম সরকার ১৯৯৭ সালে সাংস্কৃতিক বলয় ঘোষণা করে।
শেখ হাসিনা এই প্যাগোডা পরিদর্শনে গেলে বৌদ্ধ ধর্ম যাজকদের সঙ্গে ভিয়েতনামের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির প্রদেশ কমিটির সম্পাদকও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
ভিয়েতনামে ৫০টির বেশী জাতি গোষ্ঠীর বাস। তবে ভিয়েত জাতি গোষ্ঠীর মানুষই বেশি। Vietnam
মেকং এবং রেড রিভার ভিয়েতনামের প্রধান নদী। হ্যানয় সিটির ভেতর দিয়ে রেড রিভার(লৌহিত নদী) প্রবাহিত। এই দুটি নদী দিয়ে দেশের জল পথে চলাচল ও ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালিত হয়। রেড রিভারে মাছ শিকার এবং হ্যানয় শহরের মধ্যে নদীর পার ধরে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে উঠেছে।
কর্মব্যস্ত রাজধানী হ্যানয় শহর যানজটমুক্ত। গোটা শহরেই রয়েছে ফ্লাইওভার। দীর্ঘ, প্রশস্ত, সরু সব সড়কেই আধুনিক সব ধরনের যানবাহনের মাঝে মোটরসাইকেলে আধিপত্য। শহর জুড়ে অনেক বেশি মটর সাইকেল। জনসাধারণ নিত্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের জিনিস পত্র বহনের পাশাপাশি ভাড়ায় যাত্রী বহনের কাজ চলে মটরসাইকেলে।
হ্যানয় সিটিতে ভিয়েতনামের জনগণের প্রাণ পুরুষ, বিপ্লবী নেতা হোচি মিনের কোনো মুর্তি চোখে না পড়লেও সিটির প্রাণ কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছে রুশ বিপ্লবের মহানায়ক ভিআই লেনিনের বিশাল মুর্তি। সামরিক যাদুঘরের অদুরেই স্থাপিত এই লেনিনের মুর্তির পাদদেশে খোলা মাঠে প্রতি দিনই নারী, পুরুষ, শিশু শত শত পর্যটক এসে ভিড় করে।
দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষ বিজয় অর্জন করে। এই সময় বছরের পর বছর ধরে মার্কিন পরাশক্তির আক্রমণে ক্ষত-বিক্ষত ভিয়েতনামবাসী স্বাধীনতার জন্যে প্রাণপণ যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। চূড়ান্ত বিজয়ের জন্যে তাদেরকে আরো ৫বছর লড়তে হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী জনগণ নিজেদের আত্মনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের পাশাপাশি যুদ্ধরত ভিয়েতনামের জনগণের পক্ষেও রাজপথে সোচ্চার ছিলো।
বাংলাদেশের পর ভিয়েতনাম স্বাধীন হলেও এক দলীয় কমিউনিস্ট পার্টি শাসিত দেশটি যুদ্ধের ক্ষত কাটিয়ে উঠে এরইমধ্যে শক্ত অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলেছে। দেশটির মাথা পিছু আয় ৩ হাজার ৫ ডলারের মতো। যা বাংলাদেশের থেকে কয়েক গুণ।
কৃষি প্রধান ভিয়েতনামের প্রধান রফতানি পণ্য চালসহ কৃষিজাত দ্রব্য। কৃষি অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে দ্রুতই তারা কৃষিকে আধুনিকায়ন করে তোলে। কৃষি পাশাপাশি শিল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। ক্ষুদ্র, মাঝারি শিল্প সম্প্রসারণের পাশাপাশি রফতানি বাণিজ্য গড়ে তোলা ও ভারি শিল্পের দিকে দৃষ্টি দিয়েছে দেশটির সরকার।
আর এ কারণেই যুদ্ধ বিধ্বস্ত ভিয়েতনাম দ্রুতই যুদ্ধের ক্ষত কাটিয়ে উঠে শক্ত অর্থনৈতিক কাঠামো দাঁড় করানো সম্ভব হয়েছে সেদেশের সরকারি কর্মকর্তা এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তিন দিনের ভিয়েতনাম সফরকালে বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামের মধ্যে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, কৃষি, মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ খাতের উন্নয়ন যৌথ বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সহযোগিতা বাড়াতে কয়েকটি চুক্তি সই হয়।
দুই দেশের ব্যবসায়ীদের নিয়ে বাণিজ্য কাউন্সিল গঠনের সুপারিশ করা হয়। বাংলাদেশ-ভিয়েতনামের ব্যবসায়ী কমিউনিটির যৌথ বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিয়েতনামের ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
এর মধ্য দিয়ে ভিয়েতনামের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যের নতুন দিক সূচনা হবে বলে প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী ব্যবসায়ীরা মনে করেন।
0 মন্তব্য:
Post a Comment
আপনার মতামত দিন