গলির মুখে স্বজন-প্রতিবেশীর ভিড়। বাবার কোলে পরাগ মণ্ডল। পাশে হুইলচেয়ারে মা লিপি মণ্ডল। গাড়ি থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গে ফুল ছিটিয়ে, মালা পরিয়ে তাঁদের বরণ করে নেওয়া হলো। অকল্পনীয় অভ্যর্থনায় হাসি ফুটল পরাগের মুখে। ১১ নভেম্বরের শান্ত ভোরে এই গলির মুখ থেকেই বোন, মা আর গাড়িচালককে গুলি করে ছয় বছরের পরাগকে অপহরণ করেছিল সন্ত্রাসীরা। অপহরণকারীদের কাছ থেকে তিন দিন পর ছাড়া পেয়ে সে ১০ দিন ছিল হাসপাতালে। গতকাল বৃহস্পতিবার বাড়ি পৌঁছলে সোনা-রুপার পানি আর দুধ দিয়ে গোসল করিয়ে দাদি ঘরে তুলে নিলেন আদরের নাতিকে।
এর আগের রাতে শিশু পরাগের অপহরণের ঘটনায় প্রধান সন্দেহভাজন আমির আলীর মোটরসাইকেলের চালক আল আমিনসহ দুজনকে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ থেকে আটক করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এ নিয়ে অপহরণের ঘটনায় নয়জন আটক হলো। এঁদের মধ্যে তিনজন আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। চারজন আছেন রিমান্ডে।
ছাড়পত্র: গতকাল দুপুরে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতাল থেকে পরাগ ও তার মা কেরানীগঞ্জের শুভাঢ্যার পশ্চিমপাড়ার বাসায় ফিরে যান। পরাগকে তত্ত্বাবধানকারী স্কয়ার হাসপাতালের শিশু বিভাগের চিকিৎসক মাসুদুর রহমান বলেন, সুস্থ হয়ে ওঠায় গতকাল তাকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
গতকাল বেলা পৌনে তিনটার দিকে পরাগ ও তার মা হাসপাতাল ছাড়েন। লিপি মণ্ডলের বুকে গুলি লেগেছিল। হাসপাতাল ছাড়ার সময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি ও পরাগ ভালো আছি। ছেলেকে ফিরে পেতে সাহায্য করায় মিডিয়াকে (গণমাধ্যম) অনেক অনেক ধন্যবাদ।’ এরপর তাঁরা সাদা একটি মাইক্রোবাসে কেরানীগঞ্জের উদ্দেশে রওনা হন।
শুভকামনা নিয়ে শুভাঢ্যা: হাসপাতাল থেকে মাসহ পরাগ বাসায় ফিরবে—এটা আগেই জানাজানি হয়ে যায়। তাই তাদের দোতলা পাকা বাড়িটি ঘিরে ছিল স্বজন, প্রতিবেশী ও উৎসুক মানুষের ভিড়। গুলিতে আহত পরাগের বড় বোন ১১ বছরের পিনাকি মণ্ডলও বাঁ পায়ে ব্যান্ডেজ নিয়ে স্বজনদের কাঁধে ভর দিয়ে বাসা থেকে গলির মুখে এসে অপেক্ষায় ছিল। তার হাতে ছিল ফুলের মালা ও গোলাপজল। আরেক বোন আট বছরের পিয়ালীর হাতে ছিল ফুলের পাপড়ি। আর বাড়ির ফটকে ছিলেন দাদি সাবিত্রী মণ্ডল, হাতে সোনা-রুপার পানি ও দুধের জগ। পরিবারের বাইরে প্রতিবেশীদের কারও কারও হাতে ছিল ফুলের মালা।
বিকেল চারটার দিকে মাইক্রোবাস এসে থামল পশ্চিমপাড়া রাস্তার মুখে। প্রথমে গাড়ি থেকে হুইলচেয়ারে বসা লিপি মণ্ডলকে নামানো হয়। এরপর ছেলেকে কোলে নিয়ে নামেন বিমল মণ্ডল। শুরু হয় ফুল, গোলাপজল ছিটানো। বাড়ির উঠানে গিয়ে লিপি মণ্ডল মন্দিরে মাথা ঠুকে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বারবার সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞতা জানান।
তারপর সাবিত্রী মণ্ডল সোনা-রুপার পানি আর দুধ দিয়ে নাতিকে গোসল করিয়ে দেন। ঘরে ঢোকার আগে কেমন লাগছে—জানতে চাইলে পরাগ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। তারপর বলে, ‘ভালো। আগামী সপ্তাহে স্কুলে যাব।’
সাবিত্রী মণ্ডল জানান, আজ বৃহস্পতিবার নাতনি পিয়ালীর বার্ষিক পরীক্ষা শুরু হবে। কিন্তু সে স্কুলে যেতে ভয় পায়। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আপনারা আমাদের পরিবারের জন্য যা করেছেন, তা ভুলবার নয়।’
পরাগ ফেরার আনন্দে স্বজনেরা মিষ্টিমুখ করেছেন। কারও কারও চোখে ছিল আনন্দাশ্রু।
পরাগের বাড়ি ফেরা উপলক্ষে দুস্থ শিশুদের মধ্যে শীতের কাপড় ও খাবার বিতরণ করেছে পরিবার।
দুই যুবক আটক: ডিবি পুলিশ ও দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার পুলিশ মঙ্গলবার রাত নয়টার দিকে গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কাছে একটি ডিমের দোকানের সামনে থেকে আল আমিন (২২) ও শাহীন সরদারকে (২৫) আটক করে। আল আমিনের তথ্যের ভিত্তিতে অপহরণে ব্যবহূত মোটরসাইকেলটি গোয়ালন্দ উপজেলা মাঠের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়। রাতেই তাঁদের ঢাকার ডিবি কার্যালয়ে আনা হয়।
তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, ১১ নভেম্বর এই মোটরসাইকেলে করেই পরাগকে অপহরণ করা হয়েছিল। ১৩ নভেম্বর মধ্যরাতে তাকে ওই মোটরসাইকেলে করে এনে কেরানীগঞ্জের আঁটিবাজার রাস্তায় রেখে যায় সন্ত্রাসীরা।
গতকাল দুটি দৈনিকে পরাগ অপহরণের মূল পরিকল্পনাকারী আমির আলীর গ্রেপ্তারের খবর ছাপা হয়। তবে গতকাল বুধবার ঢাকা মহানগর পুলিশ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, ‘আমিরকে পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ গ্রেপ্তার করেনি। প্রচারিত সংবাদ বস্তুনিষ্ঠ নয়।’
তদন্তের সঙ্গে সম্পৃক্ত একাধিক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে জানান, মামলাটি তদন্ত করছে ডিবি ও দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার পুলিশ। অপহরণের ঘটনায় এ নিয়ে মোট নয়জন আটক হলো। এঁদের মধ্যে তিনজন অপহরণের সঙ্গে নিজেদের জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে কয়েক দিন আগে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। প্রত্যেকেই আমিরকে মূল পরিকল্পনাকারী বলে জবানবন্দি দিয়েছেন।
তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা জিজ্ঞাসাবাদে বলেছেন, পরাগ অপহরণের সময় মোটরসাইকেলটি চালাচ্ছিলেন আল আমিন, পেছনে ছিলেন আমির। বুকে গুলি করে মায়ের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে আমির পরাগকে মোটরসাইকেলে দুজনের মাঝে বসিয়েছিলেন। এই আল আমিনকেই গোয়ালন্দ থেকে আটক করা হয়। সঙ্গে আটক করা হয় মো. শাহীন সরদার নামের আরেক যুবককে। শাহীন আমিরের বন্ধু।
আটক যুবকদের পরিচয়: আল আমিনের বাড়ি গোয়ালন্দ উপজেলার শ্রীদামদত্ত পাড়ায়। একই এলাকার সরদার পাড়ায় শাহিনের বাসা। শাহিনের বিরুদ্ধে গোয়ালন্দঘাট থানায় মোটরসাইকেল ছিনতাই ও ডাকাতির মামলা রয়েছে। আল আমিন নবম শ্রেণী পর্যন্ত পড়েছেন। তিনি চার মাস আগে কাজের সন্ধানে ঢাকায় আসেন। তাঁর বিরুদ্ধে থানায় মামলা না থাকলেও মারামারি ও উচ্ছৃঙ্খলতার অভিযোগ রয়েছে।


0 মন্তব্য:
Post a Comment
আপনার মতামত দিন