দফতরবিহীন মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সুরঞ্জিত
সেনগুপ্ত রেল কেলেঙ্কারির ঘটনার সঙ্গে নিজের কোনো সম্পৃক্ততা নেই দাবি করে
বলেছেন, “তদন্ত নিয়ে আমি কখনোই ভীত ছিলাম না, এখনো নই। যত রকমের তদন্ত আছে,
করুন। জাতীয়, আন্তর্জাতিক, জাতিসংঘ, দুদক, সংসদীয় কমিটি, বিচার বিভাগীয়,
বিরোধী দলীয়- সব ধরনের তদন্ত করুন। তবে এ নিশ্চয়তা দিতে হবে, সে তদন্তের পর
আর কোনো তদন্ত হবে না।” তদন্তের স্বার্থে তিনি প্রয়োজনে দফতরবিহীন
মন্ত্রীর পদ থেকেও পদত্যাগ করতে প্রস্তুত বলেও জানিয়ে বলেন, একবার নয়, বার
বার শত বার পদত্যাগ করতে পারি।
বুধবার দুপুর ১২টায় জাতীয় সংসদ ভবনের মিডিয়া সেন্টারে পূর্ব নির্ধারিত এক সংবাদ সম্মেলনে সুরঞ্জিত এসব কথা বলেন। সম্প্রতি একটি বেসরকারি টেলিভিশনে তার সাবেক এপিএসের গাড়িচালক আজম খান রেলের অর্থ কেলেঙ্কারির দায়ভার তার ওপর চাপিয়ে যে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন, এর প্রতিক্রিয়ায় সুরঞ্জিত এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন।
তদন্তে নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে সব ধরনের অভিযোগ থেকে মুক্তি চান বলে মন্তব্য করেন সুরঞ্জিত। দুর্নীতির অভিযোগ এনে হেনস্তা করায় নিজের ও পরিবারের সম্মানহানি হয়েছে দাবি করে তিনি প্রশ্ন রাখেন, “পৈত্রিক সম্পত্তি থাকা কি অপরাধ?”
ড্রাইভার আজম খান রাজনৈতিক ভাষায় কথা বলছেন অভিযোগ করে সুরঞ্জিত বলেন, “তার ভাষা ও বেশভুষা দেখে মনে হচ্ছে, তাকে কেউ শিখিয়ে-পড়িয়ে এনে মিডিয়ার সামনে কথা বলিয়েছে।”
সুরঞ্জিত প্রশ্ন করেন, “আজম খান এতদিন কোথায় ছিল, কে তাকে আশ্রয় দিয়েছিল, কার ইন্ধনে সে ছয় মাস পর ওই চিহ্নিত একটি টেলিভিশনকে সাক্ষাৎকার দিল? ছয় মাস আগে দুদক যখন তদন্তের জন্য তাকে বারবার ডেকেছে তখন সে কেন আসেনি।”
সুরঞ্জিত এই ঘটনাকে তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, “রাজনীতিবিদদের চরিত্র হননের অপচেষ্টা এটাই নতুন নয়। আগে অনেক হয়েছে, ভবিষ্যতেও হবে।” তবে আমিই যেন শেষ শিকার হই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সুরঞ্জিত বলেন, “আমার এবং আমার নিরাপরাধ পরিবারকে রক্ষার জন্য কতিপয় সংবাদ মাধ্যমের বিরুদ্ধে আমি আইনের আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছি।”
নিজের পরিবারের কথা বলতে গিয়ে তিনি আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, “রাজনীতি করার কারণে আমার নিরীহ পরিবার ষড়যন্ত্রের শিকার হোক তা চাই না।”
সুরঞ্জিত বলেন, “আমাদের যেমন আমলনামা রয়েছে, ঠিক মিডিয়া মালিকদেরও আমলমানা আছে।” আইন শুধু আমাদের জন্য, তাদের জন্য নয় প্রশ্ন রাখেন তিনি।
তবে কবে, কোথায়, কোন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করবেন তা স্পষ্ট করেননি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের এই সদস্য।
সংবাদ সম্মেলন শুরুতেই তিনি সাংবাদিকদের প্রশ্ন করেন, “বন্ধুরা সংবাদ পরিবেশনের সময় একবারও আমার দীর্ঘ ৫৫ বছরের রাজনীতির দিকে তাকালেন না।”
তিনি দাবি করেন, শেয়ারবাজারসহ বিভিন্ন ইস্যুতে সংসদ ও সংসদের বাইরে জোরালো বক্তব্য রাখায় তার বিরুদ্ধে এই ষড়যন্ত্র হচ্ছে। তিনি সব সময় রাজনীতি ও মিডিয়ার পক্ষে জোরালো অবস্থান গ্রহণ করেছেন বলেও জানান।
দুদকের তদন্তে তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন দাবি করে সুরঞ্জিত বলেন, “রেলের কেলেঙ্কারির ঘটনায় আমার সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠলে তদন্তের স্বার্থে আমি পদত্যাগ করি। কিন্তু তদন্তে নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ার পর যারা আমাকে দোষারোপ করেছিলেন তারা কেউ দুঃখ প্রকাশ করেননি। অথচ তাদেরকে আমি কিছু বলিনি।”
সুরঞ্জিত বলেন, “এখনো আমাকে পদত্যাগ করার কথা বলা হচ্ছে। আমার তো কোনো পদই নেই, পদত্যাগ করবো কোথায় থেকে। আমাকে বলা হয় ‘উজিরে খামোখা।’ অথচ উপমহাদেশের প্রখ্যাত রাজনীতিক জওহর লাল নেহেরুও দফতরবিহীন মন্ত্রী ছিলেন। তিনি পরবর্তী সময়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রীও হন।”
“আমার বন্ধু মওদুদ (বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ) বলছেন, পদত্যাগ করতে। হয়ত একসময় বলবেন দেশত্যাগ করুন। দোষী প্রমাণিত হলে সব ধরনের প্রশাসিক কর্মকাণ্ড থেকে সরে যাবো।”
যেকোনো তদন্তে তিনি প্রস্তুত জানিয়ে বলেন, “জাতীয়, আন্তর্জাতিক, বিচার বিভাগীয় যত ধরনের তদন্ত হতে পারে সব কিছুতে আমি প্রস্তুত। প্রয়োজনে পদত্যাগ করে তদন্ত কমিটিকে সহযোগিতা করবো।”
সুরঞ্জিত তার বক্তব্যে বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার মওদুদের সমালোচনা করে বলেন, “বিদেশী গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই এসে তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়ে যায়, তখন তো পদত্যাগ করলেন না?”
সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত প্রশ্ন করেন, “সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে ছয় মাস আগেই তো আমি রেলমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেছি। ছয় মাস পরে কোন পদ থেকে পদত্যাগ করবো? আমার কি পদ আছে? দফতরবিহীন মন্ত্রীর পদ থেকে কীভাবে পদত্যাগ করবো? আপনারা কি দেখেছেন আমি মন্ত্রিসভার বৈঠকে যাই?”
“আপনারা আমার সব কেড়ে নিতে পারবেন, নাগরিকত্ব কাড়তে পারবেন না। আমি মুক্তিযুদ্ধ করেছি” বলেন সুরঞ্জিত।
মওদুদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, “আপনাদের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিংসহ বিভিন্ন মামলা আছে, তাহলে আপনারা কি পদত্যাগ করবেন?”
উল্লেখ্য, গত ৬ অক্টোবর শুক্রবার ও শনিবার বেরসরকারি টেলিভিশন আরটিভিতে দ্বিতীয় পর্বের সাক্ষাৎকারে চাঞ্চল্যকর অনেক তথ্য ফাঁস করেন সাবেক রেলমন্ত্রীর এপিএস ওমর ফারুকের গাড়িচালক আজম খান।
প্রসঙ্গত, গত ৯ এপ্রিল রাতে সুরঞ্জিতের এপিএস ওমর ফারুক তালুকদারের গাড়িতে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাওয়ার ঘটনা প্রকাশ হওয়ার পর থেকে তা নিয়ে শোরগোল শুরু হয়। ফলে চাপের মুখে পড়েন রেলমন্ত্রী। ১৬ এপ্রিল ব্যক্তিগত সহকারীর ‘অর্থ কেলেঙ্কারির’ দায় নিজের কাঁধে নিয়ে রেলমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ান সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। পরে দুদক তদন্তে সুরঞ্জিতকে নির্দোষ প্রমাণ করে।

0 মন্তব্য:
Post a Comment
আপনার মতামত দিন