![]() |
| banglarbarta24.com |
বাবা মায়ের কোল আলো করে ছোট্ট মেয়ে দিলুফা আক্তার (১৩) এর জন্ম ১৯৯৯ সালের ২১ মে। মা বাবার আদরে একটু একটু করে বেড়ে উঠছিল সে। বাবা মোঃ দুলাল এবং মা রাফেজা বেগম। কিন্তু সুখী পরিবারটিতে হঠাৎই নেমে আসে ঝড়। দিলুফার বয়স তখন মাত্র ৯ বছর, সড়ক দূর্ঘটনায় মারা যায় তার বাবা। দিলুফার মাকে তিনটি ছোট্ট সন্তানসহ বের করে দেয়া হয় দাদাবাড়ি থেকে। দিলুফার মা আশ্রয় নেন তার বাবার বাড়িতে। ছোট্ট দিলুফা আর তার দুই ভাইকে নিয়ে মা আশ্রয় নেন নানাবাড়ি। সংসার চালাতে তিনি বেছে নেন মানুষের বাসায় বাসায় দিনমজুরির কাজ। কিন্তু এত ভয়াবহ দারিদ্র্য আর জীবন সংগ্রামের মাঝেও তিনি কখনোই তার সন্তানদের পড়াশোনা থামতে দেননি।
“রঙ শেষ হয়ে যাবে, তাই গাঢ় করে আঁকি না।”
ময়মনসিংহের ‘ফুনডাসিয়ন ইন্টারভিডা শিক্ষালয় আকালিয়া’তে আর্টওয়ার্ক ক্যাম্পেইনে ক্লাস ফাইভে রং-পেন্সিল আর ‘আর্টওয়ার্ক টেমপ্লেট দেয়ামাত্রই সব বাচ্চারা খুশিতে চিৎকার করে ওঠে। এক মুহূর্তও তারা আর সময় নষ্ট করে না। এরই মাঝে দিলুফাও আঁকছিল। অন্যরা যেখানে ইচ্ছেমত রঙ করছিল সেখানে দিলুফার রঙের ব্যবহার ছিল একটু অন্যরকম। তার রঙে যদিও বৈচিত্র্য ছিল কিন্তু সে আলতো করে ক্রেয়ন ধরে খুব হালকা শেডে রং করছিল। তাকে যখন এর কারণ জিজ্ঞেস করা হল, সে জানায়, ‘বছরে একবারই তো ইন্টারভিডা স্কুল থেকে ক্রেয়ন পাই। এটা দিয়েই সারা বছর আঁকতে হবে। গাঢ় করে আঁকলে তো তাড়াতাড়ি রঙ শেষ হয়ে যাবে। তাই হালকা করে আঁকি।’
“আমার প্রিয় রঙ সবুজ। কিন্তু সবুজ তো অনেক রকম। প্রকৃতির এত রকম সবুজকে আমি কী করে ক্রেয়ন বক্সের একটা মাত্র সবুজ রঙ দিয়ে আঁকবো? দিলুফার রঙ সম্পর্কে ধারণা সত্যিই তীক্ষ্ম আর লক্ষ্য করার মত। সে প্রতিটি রঙের খুব সুক্ষ্ম সুক্ষ্ম শেডের পার্থক্য আলাদা করতে পারে। সাধারণত এই ধরনের ধারণা তৈরির জন্য দীর্ঘ সময় চর্চার প্রয়োজন। কিন্তু সে এমন কোন শিক্ষণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে না গিয়েই এটি রপ্ত করেছে। সে জানায়, যদিও সব পাতার রঙ-ই সবুজ, এদের শেডের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। আমগাছের পাতা, ঘাস আর কচুরিপানার রঙ নিশ্চয়ই এক নয়। সে কিছুতেই এত রকম শেডকে সাথে ক্রেয়ন বক্সের একটি মাত্র রঙের সাথে মেলাতে পারে না।
ময়মনসিংহ থেকে ‘আকালিয়া’ নামক স্থানটির অবস্থান অনেক দূরে। একে প্রায় প্রান্তিক বললে ভুল হবে না। অধিকাংশ মানুষ এখানে কৃষিজীবী। পরিবারের অর্থনীতি পিতৃতান্ত্রিক। নারীরা সাধারনত গৃহস্থালীর কাজের সাথে যুক্ত থাকেন। নারীদের জন্য এখানে কোন নির্দিষ্ট সম্মানজনক পেশা নেই। তাই দিলুফার মায়ের মত অসহায় দরিদ্র নারীদের অর্থোপার্জন আর নিজেদের পরিবারকে টিকিয়ে রাখতে প্রতিনিয়ত সংগ্রামের মধ্য দিয়েই যেতে হয়। দিলুফার বাড়ি থেকে স্কুলে হেঁটে যেতে প্রায় ২০ মিনিটের মত সময় লাগে। কিন্তু বর্ষাকালে বেশীরভাগ রাস্তাই পানির নীচে তলিয়ে যায় এবং রাস্তাগুলো কর্দমাক্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু দিলুফা বড়সড় অসুস্থতা ছাড়া কখনোই স্কুল ফাঁকি দেয় না।
“আমি বড় হয়ে আমার মায়ের জন্য এই মনিপুরী নৃত্যশিল্পীর মতই একটা রঙিন শাড়ী কিনবো। আমার মায়ের একটাও ভাল শাড়ী নেই।”
ক্লাস ফাইভের জন্য নির্বাচিত মনিপুরী নৃত্য এবং ভাষা আন্দোলন দুটি আর্টওয়ার্ক টেমপ্লেটই দিলুফা খুব সুন্দরভাবে রঙ করছিল। সে জানায় মনিপুরী নৃত্যের আর্টওয়ার্কটি রঙ করতে তার বেশী ভাল লেগেছে কারণ, সে এটাতে ইচ্ছেমত রঙ ব্যবহার করতে পারছে। এছাড়াও সে ভাষা আন্দোলনের টেমপ্লেটে প্রচুর লাল রঙ ব্যবহার করেছে। এর কারণ হিসেবে সে বলে, আমরা প্রচুর রক্তের বিনিময়ে আমাদের বাংলা ভাষা পেয়েছি। তাই এই রঙটি বেশি ব্যবহার করেছি।
“আমার স্কুল আমার কাছে অনেক কিছু।”
স্কুল আমার ভীষণ প্রিয়, পড়াশোনার পরিবেশ তো এখানেই ! দিলুফার নানাবাড়িতে একান্নবর্তী পরিবারে ছোট্ট ঘরে গাদাগাদি করে থাকে অনেক মানুষ। সেখানে ছবি আঁকা এক ধরনের বিলাসিতা। আর এত কোলাহলের মাঝে পড়াশোনার পরিবেশ তো কল্পনামাত্রবাবা বেঁচে থাকার সময় সে ছিল খুবই ভাল ছাত্রী। ক্লাসে তার রোল নাম্বার ছিল দুই। কিন্তু বাবা মারা যাবার পর নতুন এই পরিবেশে এসে অনেক চেষ্টা করেও সে তার পড়াশোনার মান ধরে রাখতে পারেনি। বর্তমানে তার রোল নেমে এসেছে ৮ এ। দিলুফা তার স্কুলকে অনেক বেশি ভালবাসে, ফুনডাসিয়ন ইন্টারভিডা তাকে বিনামূল্যে পড়াশোনাসহ অন্যান্য অনেক সুবিধা দিয়েছে। যার কারণে সে অজো তার পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারছে। স্কুলই সেই জায়গা যেখানে সে তার পড়াশোনার পরিবেশ খুঁজে পায়।
কথোপকথনের শুরুতে দিলুফাকে ভীষণ বিষন্ন দেখাচ্ছিল। কিন্তু রঙ, আর্টওয়ার্ক আর তার নিজের সম্পর্কে কথা বলতে বলতে ক্রেয়ন বক্সের নানা রঙের মতই রঙিন হয়ে ওঠে দিলুফার হাস্যোজ্জ্বল মুখ। বড় হয়ে সে একজন ডাক্তার হতে চায়। ঠিক যেমনটা তার বাবাও চেয়েছিলেন। ততক্ষণে আর্টওয়ার্ক ক্যাম্পেইন শেষ। কিন্তু দিলুফা তখনো তার নোটবুকে ক্রেয়ন দিয়ে কী যেন আঁকিবুকি কাটছিল। ধীরে ধীরে সেখানে ভেসে ওঠে একজন মানুষের প্রতিকৃতি। দিলুফার চোখে জল, মুখে হাসি, জানায়... ‘আমার বাবার মুখ...’
`Bringing our Collaborators and Children Together প্রকল্পের আওতায় এ বছর শিক্ষামূলক অঙ্কন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করছে প্রায় ৮,১০০ শিশু। ১৩ মে ২০১২ থেকে ২২ জূলাই ২০১২ তারিখ পর্যন্ত মোট ৭,৭৩৮ জন শিশু এই ক্যাম্পেইনে অংশগ্রহন করেছে। তাদের মধ্যে দিলুফা একজন। ৩০ আগস্ট ২০১২ পর্যন্ত এই কর্মসূচি চলবে। শিক্ষামূলক অঙ্কন কর্মসূচির আওতায় ফুনডাসিয়ন ইন্টারভিডা বাংলাদেশ এর ৩৫ টি স্কুলের শিক্ষার্থীরা ৬ টি স্বতন্ত্র বিষয় ভিত্তিক আর্টওয়ার্ক টেমপ্লেট রং করায় অংশগ্রহণ করছে। এগুলো হলÑ ১.বটগাছ ২.চরকি ৩.সবার জন্য শিক্ষা ৪.বৈশাখী মেলা ৫.মনিপুরী নৃত্য ৬.ভাষা আন্দোলন


0 মন্তব্য:
Post a Comment
আপনার মতামত দিন