শনিবারের পর রোববারও দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে হরতাল ডেকেছে তেল-গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি।
উন্মুক্ত কয়লা খনির পক্ষে তৎপরতা বন্ধ এবং এশিয়া এনার্জিবিরোধী সমাবেশে বাধা দেয়ার প্রতিবাদে শনিবার দিনব্যাপী হরতালের পর বিকালে নিমতলা মোড়ে সমাবেশ থেকে এই কর্মসূচি ঘোষণা করেন কমিটির ফুলবাড়ী শাখার আহ্বায়ক সৈয়দ সাইফুল ইসলাম জুয়েল।
অন্যদিকে ফুলবাড়ীর সম্মিলিত ব্যবসায়ী সমিতির পক্ষে ফুলবাড়ী ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও পৌর মেয়র মানিক সরকার বাজার রোডে অন্য এক সমাবেশে লাগাতার হরতালের ঘোষণা দেন।
উভয় সমাবেশে নেতারা বলেন, উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের তৎপরতা বন্ধ, ফুলবাড়ীর চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নসহ ব্রিটিশ কোম্পানি এশিয়া এনার্জিকে সহায়তা করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জারি করা নির্দেশনা প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত তাদের আন্দোলন চলবে।
সকাল-সন্ধ্যা হরতালে শনিবার অচল ছিল ফুলবাড়ী উপজেলা সদর। গাড়ি চলাচল বন্ধ ছিল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ক্লাস হয়নি, বন্ধ ছিল দোকান-পাটও।
হরতালকারীরা সকাল পৌনে ১০টার দিকে ফুলবাড়ী স্টেশনে একটি ট্রেন আটকে এর জানালার কাঁচ ভাংচুর করে।
ফুলবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান জানান, পিকেটাররা ঢাকাগামী দ্রুতযান ট্রেনের জানালার কাঁচ ভাংচুর করেছে। পরে ১০টা ৫০ মিনিটে ট্রেনটি ছেড়ে দেয়া হয়।
একই সময়ে সৈয়দপুর থেকে ছেড়ে আসা খুলনাগামী রূপসা এক্সপ্রেস ভবানীপুরে স্টেশনে আটকা পড়ে।
হরতাল সমর্থকরা সকাল ৮টা থেকে শহরের ঢাকা মোড়, নিমতলা মোড়, বাসস্ট্যান্ড, বাজার রোড, হাসপাতাল রোডে টায়ার জ্বালিয়ে অবস্থান নিয়েছে। তেল গ্যাস রক্ষা জাতীয় কমিটি ও ফুলবাড়ী ব্যবসায়ী সমিতি শহরের বিভিন্ন সড়কে হরতালের সমর্থনে বিক্ষোভ মিছিল করে।
উপজেলা চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম বাবলুর নেতৃত্বে তেল-গ্যাস রক্ষা জাতীয় কমিটির সমর্থকরা নিমতলা মোড়ে এবং পৌর মেয়র মানিক সরকারের নেতৃত্বে ব্যবসায়ী সমিতির সমর্থকরা বাজার রোডে অবস্থান নিয়ে পিকেটিং করে।
ভোর থেকে শহরের বিভিন্ন সড়ক ও মোড়ে পুলিশ মোতায়েন ছিল।
তেল-গ্যাস রক্ষা কমিটি শুক্রবার সমাবেশ ডেকেছিল। ওই সমাবেশকে কেন্দ্র করে স্থানীয় প্রশাসন পৌর এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করলেও তা উপেক্ষা করেই সমাবেশ করে তেল-গ্যাস রক্ষা কমিটি।
২০০৬ সালের ২৬ অগাস্ট ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা খনি প্রকল্প বাতিল এবং উত্তোলনকারী কোম্পানি এশিয়া এনার্জিকে প্রত্যাহারের দাবিতে তেল-গ্যাস রক্ষা জাতীয় কমিটির মিছিল-সমাবেশে গুলি চালায় পুলিশ। এতে নিহত হন আল আমিন, সালেকীন ও তরিকুল। এছাড়া আহত হন দুই শতাধিক।
ওই ঘটনার পর স্থানীয়রা বিক্ষোভে ফেটে পড়লে তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ফুলবাড়ীবাসীর সঙ্গে চুক্তি করে পরিস্থিতি শান্ত করে। চুক্তিতে নিহতদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার পাশাপাশি উন্মুক্ত পদ্ধতিতে খনন না করার কথাও বলা হয়।
ওই সময় স্বাক্ষরিত ৬ দফা চুক্তির মধ্যে আরো ছিল- এশিয়া এনার্জিকে দেশ থেকে বহিষ্কার, নিহতদের স্মরণে স্মৃতি সৌধ নির্মাণ, গুলিবর্ষণকারীদের শাস্তি দেওয়া, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের সব মামলা প্রত্যাহার।
নিহত ও আহতদের কিছু ক্ষতিপূরণ ও মামলাও প্রত্যাহারের দাবি পূরণ হলেও অন্য দাবিগুলো পূরণ হয়নি; যদিও ওই ঘটনার পর তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনাও ফুলবাড়ীতে এক জনসভায় চুক্তি বাস্তবায়নের আশ্বাস দিয়েছিলেন।
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার এই বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত না নিলেও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা তৌফিক-ই ইলাহী চৌধুরী ও জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি সুবিদ আলী ভূইয়া উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা আহরণের পক্ষে বলে আসছেন।
সর্বশেষ পদক্ষেপ হিসেবে গত মাসের ১৪ অক্টোবর ফুলবাড়ী কয়লাখনি এলাকায় একাধিক জরিপকাজে এশিয়া এনার্জিকে সহায়তা করার নির্দেশনা দিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে স্থানীয় প্রশাসনকে চিঠি পাঠানো হয়।
চিঠিতে বলা হয়, কোম্পানিটি পূর্ববর্তী অনুসন্ধানের কার্যকরিতা, কৃষি সম্ভাব্যতা, জনসংখ্যা, ভূ-গর্ভস্থ পানি ব্যবস্থাপনা, পরিবেশগত উন্নয়নসহ সমগ্র প্রকল্প সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করতে চায়। খনিজ অনুসন্ধান লাইসেন্স ও খনি লিজ থাকায় তাদের এসব কাজ করার অধিকার আছে।


0 মন্তব্য:
Post a Comment
আপনার মতামত দিন