নাটোরের উত্তরা গণভবন দর্শনার্থীদের জন্য বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে উন্মুক্ত হচ্ছে। যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আহাদ আলী সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এটি উন্মুক্ত করেন। এখন দেশের যে কোনো নাগরিক ১০টাকার টিকিটের বিনিময়ে গণভবন দর্শন করতে পারবেন।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, উত্তরা গণভবন পরিদর্শনের ব্যবস্থা করতে সিসিটিভি ক্যামেরা, আর্চওয়ে, মেটাল ডিকটেটরসহ বিভিন্ন নিরাপত্তা উপকরণ, রিসিপশন ডেস্ক, গাইডের ব্যবস্থা করা হয়েছে। দর্শনার্থীরা জনপ্রতি দশ টাকা দিয়ে ছুটির দিনসহ প্রতিদিন সকাল ১১টা থেকে বিকাল চারটা পর্যন্ত গণভবন পরিদর্শন করতে পারবেন।
প্রায় ৩০০ বছরের প্রাচীন দিঘাপতিয়া রাজবাড়িটিই নাটোরের উত্তরা গণভবন হিসেবে পরিচিত। দিঘাপতিয়া রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা রাজা দয়ারাম রায় ১৭০৬ রাজা রামজীবনের কাছ থেকে উপহার হিসেবে পাওয়া জমিতে ১৭৩৪ সালে স্থাপত্যকলার অন্যতম নিদর্শন দিঘাপতিয়া রাজপ্রাসাদটি নির্মাণ করেন। তিনি নাটোরের মূল শহর থেকে প্রায় দু’মাইল উত্তরে নাটোর-বগুড়া মহাসড়কের পাশে দিঘাপতিয়া ইউনিয়নে এ রাজপ্রাসাদটি নির্মাণ করেন।
রাজবংশের ষষ্ঠ রাজা প্রমদা নাথ রায়ের সময় ১৮৯৭ সালের ১০ জুন নাটোরের ডোমপাড়া মাঠে তিনদিনব্যাপী বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের এক অধিবেশন আয়োজন করেন।
বিশ্বকবি রবিন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ অনেক বরেণ্য ব্যক্তি এ অধিবেশনে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে যোগ দেন। অধিবেশনের শেষ দিন ১৮৯৭ সালের ১২ জুন প্রায় ১৮ মিনিটব্যাপী এক ভূমিকম্পে প্রাসাদটি ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়। এ প্রাসাদটি ধ্বংস প্রায় হয়ে গেলে রাজা প্রমদা নাথ রায় ১৮৯৭ সাল থেকে ১৯০৮ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১১ বছর সময় ধরে বিদেশী বিশেষজ্ঞ, প্রকৌশলী ও চিত্রকর্ম শিল্পী আর দেশী মিস্ত্রিদের সহায়তায় সাড়ে ৪১ একর জমির ওপর এই রাজবাড়িটি পুনঃনির্মাণ করেন।
১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর দিঘাপতিয়া রাজা দেশত্যাগ করে ভারতে চলে যান। ১৯৫০ সালে জমিদারি অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন পাশ হওয়ার পর দিঘাপতিয়ার রাজ প্রাসাদটির রক্ষণা-বেক্ষণে বেশ সমস্যা দেখা দেয়। সমস্যা সমাধানে ১৯৬৬ সালে এ রাজভবন ইস্ট পাকিস্তান হাউজে পরিণত হয়। ১৯৬৭ সালের ২৪ জুলাই তৎকালীন গর্ভনর মোনায়েম খান এটিকে গর্ভনর হাউসে রূপান্তরিত করেন।
স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান এটিকে উত্তরা গণভবন হিসেবে ঘোষণা দেন। আর ১৯৮০ সালের ১৭ নভেম্বর জিয়াউর রহমান ঢাকার বাইরে প্রথম এ ভবনেই মন্ত্রীসভার বৈঠক করে ইতিহাস সৃষ্টি করেন। পরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া, সাবেক রাষ্ট্রপতি জাপা চেয়ারম্যান হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদ ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা সে ধারাবাহিকতা রক্ষা করে এই রাজবাড়িতে মন্ত্রীসভার বৈঠক করেছেন।
বর্তমান মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে অনেক বার আবার মন্ত্রীসভার বৈঠক হবার কথা শোনা গেলেও তাদের প্রথম চার বছরে তা হয়নি। গত ফখরুদ্দিনের তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রথমে নাটোরের উত্তরা গণভবন দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করার সিন্ধান্ত নেন। পরে কয়েক দফা প্রচেষ্টার পর অবশেষে বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে জনগণের জন্য উত্তরা গণভবন উন্মুক্ত হচ্ছে।
গণভবনে রয়েছে প্রাচীন স্থাপত্যশৈলির সুবিন্যাস্ত ভবন, দেশী বিদেশী ফল ও ফুলের প্রচুর গাছ, ইটালী থেকে রাজার নিয়ে আসা মূর্তি ও গাছসহ ইটালিয়ান গার্ডেন, সে সময়ের কয়েকটি কামান ও বিদেশী দামী পাথরের মূর্তি ও ভবন অভ্যন্তরে রয়েছে রাজার ব্যবহার্য নানা তৌজস পত্র। যা আজও রয়েছে প্রাচীন আদলেই যদিও অনেক জিনিস ইতোমধ্যে জাতীয় যাদুঘরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
এছাড়া রাজার সিংহাসন, যুদ্ধে ব্যবহৃত বর্ম ও রাজার মন্ত্রী পরিষদের বৈঠক খানা যেখানে এখনো মন্ত্রী পরিষদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
গণভবনের বহিরাংশ দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা হলেও অভ্যন্তরে প্রবেশে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। জেলা প্রশাসনের বিশেষ অনুমতি ছাড়া সেখানে প্রবেশ করা যাবে না।
এ ব্যাপারে নাটোরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. সাখাওয়াৎ হোসেন বলেছেন, বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে জনগণের জন্য উত্তরা গণভবন উন্মুক্ত করতে জেলা প্রশাসন সব ধরনের প্রস্তুতি শেষ করেছে। এখানে প্রয়োজন মতো পুলিশ, জনবল ও সিসি ক্যামারে ছাড়াও আর্চওয়ে, মেটাল ডিকটেটর সহ বিভিন্ন নিরাপত্তা উপকরণ, রিসিপশন ডেস্ক ও গাইডের ব্যবস্থা করা হয়েছে।


0 মন্তব্য:
Post a Comment
আপনার মতামত দিন